নিরীহ মানুষের লাশে ভর করে হাজার কোটি টাকার মালিক বিএনপি নেতা লিয়াকত

285
 নেজাম উদ্দিন সোহান |  শনিবার, জুলাই ২, ২০২২ |  ৮:২৭ অপরাহ্ণ
লিয়াকত
       
Advertisement

* এস আলমে ভর করে হাজার কোটি টাকার মিশন

* রয়েছে সুগন্ধায় ফ্ল্যাট, আলিশান গাড়িও

Advertisement

* নামে-বেনামে সম্পদের পাহাড়

* ভূমি অধিগ্রহণে কমিশন বাণিজ্য

১০ লাশের বিনিময়ে বৃহত্তর শিল্প প্রতিষ্ঠান এস আলমের ওপর ভর করে হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অবৈধ এই আয় দিয়ে ৫ বছরে নগরীতে কিনেছেন ফ্ল্যাট, বানিয়েছেন বাড়ি, নিজের জন্য কিনেছেন আলিশান গাড়িও। এছাড়া স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, নিজের বোন ও বোন জামাইসহ ব্যক্তিগত সহকারির নামে গড়েছেন সম্পদের পাহাড়ও- এমন অভিযোগ ওঠেছে অল্প সময়ের ব্যবধানে কোটিপতি বনে যাওয়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির বহিস্কৃত নেতা, বাঁশখালীর গণ্ডামারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলীর বিরুদ্ধে।

চলতি বছরের ৫ ও ৮ জুন দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয় ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে এ সংক্রান্ত অভিযোগপত্র জমা দেন মো. সেলিম উল্লাহ নামের এক ব্যক্তি। সেই অভিযোগেই ওঠে আসে কয়েক বছর আগে লাখ টাকার চেক প্রতারণা মামলায় জেল খাটা চেয়ারম্যান লিয়াকতের অবৈধভাবে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার তথ্য।

অভিযোগপত্র থেকে জানা গেছে, দেশের শিল্প গ্রুপ এস আলম কর্তৃক গণ্ডামারায় ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে ‘বসতভিটা ও গোরস্থান রক্ষা কমিটি’ নামে একটি নামকাওয়াস্তে সংগঠন তৈরি করেন লিয়াকত। সেই সংগঠনের ব্যানারে এলাকার সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে উস্কানি দিয়ে উন্নয়ন প্রকল্প ও সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেন তিনি।

সেসময়ে (২০১৬ ইং) সরকার বিরোধী বিভিন্ন সমাবেশে মিথ্যা তথ্য ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে শান্তিপ্রিয় মানুষকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেন। মূলত তার উস্কানিতে এলাকাবাসির সাথে প্রশাসনের সংঘর্ষে নিহত হন ৫ সাধারণ মানুষ।

পরে কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিভিন্ন কাজে প্রভাব খাটিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পের বিভিন্ন প্রতিনিধির কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন লিয়াকত চেয়ারম্যান। এর মাধ্যমে গত কয়েক বছরে নামে-বেনামে স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, নিজের বোন ও বোন জামাইসহ বিশ্বস্থদের নামে শত শত একর জমি কিনে হাজার কোটি টাকার মালিক বনে যান লিয়াকত। জমি সংক্রান্ত দাগ ও তারিখসহ ৩৬টি দলিলের নম্বর তুলে ধরা হয় দুদকে দেওয়া সেই অভিযোগপত্রে।

এছাড়াও এস আলম পাওয়ার প্লান্টের ভূমি সমন্বয়কারী মো. নাছির উদ্দিনের কাছ থেকে নানা বাহানায় ১৮টি চেকের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন তারিখে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন লিয়াকত।

সিটিজি নিউজের হাতে আসা দুদকের অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ২৬ মে- ৯৪৭১৭৬২ নম্বর চেকের মাধ্যমে মো. নাছির উদ্দিনের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ১০ লাখ টাকা। একই বছরের ২০ জুন- ৯৫৫৬১৫৬ চেকে ১০ লাখ, ২৯ জুন- ৯৫৫৬১৫১ নম্বর চেকে ১০ লাখ, ১৬ জুলাই-৯৫৫৬১৯২ চেকে ৫ লাখ, ২৩ জুলাই- ৯৫৫৬১৩৩ চেকে ৫ লাখ, ১২ আগস্ট-৯৭২১৫০৩ চেকে ৫ লাখ, ২৪ আগস্ট- ৯৭২১৬০৮ চেকে ৫ লাখ, ৪ সেপ্টেম্বর ৯৮২১২৪০ চেকে ৫ লাখ, ২৮ সেপ্টেম্বর- ০৩৬৫৬৮৮ চেকে ১০ লাখ, ২ অক্টেবর- ৯৮২১২৪১ চেকে ৫ লাখ, ১৯ অক্টেবর-৯৮৯৭৮৯০ ও ৯৮৯৭৮৯১ চেকে ১০ লাখ, ২১ নভেম্বর ৯৮৯৭৮৪৮ চেকে ১০ লাখ ও ১৪ ডিসেম্বর- ৯৮৯৭৮৮৯ চেকে ১০ লাখ টাকা।

এছাড়াও ২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারি-০৩৬৫৬৯৬ চেকে ৫ লাখ, ১০ ফেব্রুয়ারি- ০৩৬৫৬৯৭ চেকে ৫ লাখ, ২৫ মার্চ- ০৩৬৫৬৯৮ চেকে ১০ লাখ এবং ২৪ মে- ৪৭১৩৭০৪ চেকে ১০ লাখ টাকা চাঁদা নেয়।

তথ্যমতে, ২০১৬ সালে থেকে এই পর্যন্ত এস আলম গ্রুপের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের প্রত্যেকের মৃত্যুর নেপথ্যে রয়েছেন বিএনপির বহিস্কৃত এই নেতা। সেখানে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে ৪ এপ্রিল। সে সময়ে সরকার ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে স্থানীয় ১০ হাজার মানুষকে ভিটে-বাড়ি ছাড়া করাসহ পাওয়ার প্লান্টের আশেপাশে জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশু প্রতিবন্ধী হবে-এমন গুজবও ছড়িয়েছিলেন লিয়াকত।

লিয়াকতের সরকার বিরোধী এবং প্রকল্প নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য বিশ্বাস করে প্রশাসনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হন স্থানীয়রা। এ ঘটনায় ৪ জন নিহত হন। এরপর ২০১৭ সালের ১৭ এপ্রিল বিদ্যুৎ প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সাথে সমঝোতা বৈঠকে লিয়াকতের নির্দেশে গুলিতে নিহত হন মুহাম্মদ আলী নামে আরও একজন। নথি থেকে জানা যায় সেই হত্যা মামলার ১নং আসামীও লিয়াকত।

এছাড়াও ২০২১ সালের ১৭ এপ্রিল ওই প্রকল্পে বেতন ও কর্মঘন্টা নিয়ে বিরোধের জেরে সংঘর্ষে নিহত হন আরও ৫ জন। ওই সংঘর্ষের কারণ হিসেবে তখন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ব্যক্তিগত সহকারী আকিজ উদ্দিন গণমাধ্যমের কাছে পরোক্ষভাবে লিয়াকতকে দায়ি করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, প্রকল্পের শুরু থেকে একটি স্বার্থান্বেষী মহল তা না হওয়ার জন্য ষড়যন্ত্র করেছিল। সেদিনের ঘটনাও পূর্বের ঘটনার সূত্র ধরেই ঘটেছে। এখনও সেইসব দুষ্কৃতকারী এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে পায়তারা করছে।

তবে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ব্যক্তিগত সহকারী আকিজ উদ্দিনের সাথে বিষয়টি নিয়ে মুঠোফোনে কথা বলতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি। পরামর্শ দেন পাওয়ার প্লান্টের কো-অর্ডিনেটর ফারুক আহমেদ’র সাথে কথা বলার জন্য।

জানতে চাইলে এস আলম বিদ্যুৎ পাওয়ার প্লান্টের কো-অর্ডিনেটর ফারুক আহমেদ সিটিজিনিউজকে বলেন, লিয়াকত ২০১৪/১৫ সালে চেকের মাধ্যমে কিসের টাকা নিয়েছিলেন তা আমি বলতে পারব না। কারণ সেসময়ে আমি ছিলাম না। তবে এখন বিদ্যুৎ প্লান্টের সাথে লিয়াকতের কোন ব্যবসা নেই। তাছাড়া তার বিষয়ে আমি আর কিছু বলতে পারব না। আমি একজন সাধারণ চাকুরিজীবী।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, এস আলমের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের শুরুতে গণ্ডামারা এলাকার মানুষকে বিভ্রান্ত করে আন্দোলনে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন লিয়াকত। ১০ জন নিরহ মানুষের রক্ত ঝরিয়ে এস আলমের সাথে সমঝোতা করে সে। সাধারণ মানুষকে দিয়ে আন্দোলনের মাধ্যমে এস আলমকে জিম্মি করে হাতিয়েছে হাজার কোটি টাকা। এলাকার মানুষের ৭০০ কানি জায়গা অধিগ্রহণে কমিশনের নামে হাতিয়েছে আরও কয়েক কোটি টাকা। এছাড়াও ওই এলাকার অনেকগুলো সরকারি খাস জমিতেও এস আলম থেকে বাগিয়েছেন কয়েক কোটি কোটি টাকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবারই লিয়াকত নিজ স্বার্থের জন্য এলাকার নিরীহ মানুষকে বলি দিয়েছেন। তারই কারণে তিনধাপে সংঘর্ষে নিরীহ ১০ জন মানুষ নিহত হয়েছে। এখনও ভয়ে তার বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন না এলাকাবাসি।

এদিকে বিভিন্ন চেকের মাধ্যমে লিয়াকত আলীকে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়ে এস আলম পাওয়ার প্লান্টের ভূমি সমন্বয়কারী মো. নাছির উদ্দিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সিটিজিনিউজকে বলেন, ‘আমি এখন হজে আছি। এ বিষয়ে আমি এখন কথা বলতে পারব না।’

অপরদিকে লিয়াকতের বিরোদ্ধে দুদকে অভিযোগকারী মো. সেলিম উল্লাহ সিটিজিনিউজকে বলেন, প্রথমে প্রকল্পের বিরুদ্ধে মানুষকে ক্ষেপিয়ে আন্দোলন করে চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী এস আলম কর্তৃপক্ষের কাছাকাছি চলে যায়। পরে পাওয়ার প্লান্টের ভূমি সমন্বয়কারী মো. নাছির উদ্দিনকে অনেকটা জিম্মি করে বিভিন্নভাবে চাঁদা আদায় করেন। এছাড়াও এলাকার মানুষকে ঠকিয়ে ৭০০ কানি জায়গা অধিগ্রহণে কমিশন বাণিজ্য ও বেশকিছু সরকারি খাস জায়গায় টাকা হাতিয়ে লিয়াকত হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। অবৈধভাবে অর্জিত তার এসব টাকা এখন সরকারের উন্নয়নের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের কাজে ব্যয় হচ্ছে। তাই লিয়াকত আলীর অবৈধপন্থায় গড়া এসব সম্পদের বিষয়ে খতিয়ে দেখতে আমি দুদুকে অভিযোগ করেছি।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত বাঁশখালী গণ্ডামারা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান লেয়াকত আলী সিটিজিনিউজকে বলেন, দুদুকে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গেলে তাদেরকে তদন্ত করতে বলেন। এছাড়া আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়া কারো কাছে জবাবদিহী করতে বাধ্য নই। কোনো সংবাদকর্মীকেও কোনো তথ্য দিতে রাজি না। আপনার যা লিখার তাই লিখেন।

জেইউএস/এসসি

Advertisement

CTG NEWS