ওয়ার্ড কাউন্সিলর’র কাজ করেন মনোনীত সিন্ডিকেট 

অর্ধবেলা ঘুমিয়ে কাটান কাউন্সিলর সুমন, সেবাপ্রার্থীদের দুর্ভোগ চরমে!

355
  |  শনিবার, মে ৭, ২০২২ |  ৯:০২ অপরাহ্ণ
অর্ধবেলা ঘুমিয়ে কাটান কাউন্সিলর সুমন, সেবাপ্রার্থীদের দুর্ভোগ চরমে!
       
Advertisement

নিবার্চনের সময় জনগণের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও প্রতিনিধি নিবার্চিত হওয়ার পর উল্টো চিত্রই দেখছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিকের) ৩৯নং ওয়ার্ডের বাসিন্দারা। কার্যালয়ে এসে নাগরিক সেবা প্রদান করা ওয়ার্ড কাউন্সিলরের দায়িত্ব হলেও নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকা জনপ্রতিনিধি দফতরে আসেন কালেভদ্রে।

অভিযোগ আছে— তার অনুপস্থিতিতে কাউন্সিল অফিসের সব কাজ করেন কাউন্সিলরের মনোনীত ব্যক্তিদের একটি সিন্ডিকেট। আর এ কারণেই সালিশ বিচার থেকে শুরু করে সরকারি সুযোগ সুবিধা পেতে প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন এলাকায় বসবাসরত প্রায় ৭/৮ লক্ষ স্থানীয় বাসিন্দা। তবে কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমনের দাবি, তিনি নিয়মিত অফিসে আসেন এবং তার মনোনীত ব্যক্তিদের সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে এলাকাবাসীর কোনো অভিযোগও নেই।

Advertisement

স্থানীয়রা জানায়, চসিকের নিবার্চিত কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন মধ্যরাত পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে ভোর রাত থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত বাসায় ঘুমান। সে কারণে বছর-ছয় মাসেও একবার আসেন না ওয়ার্ড অফিসে। অফিসিয়াল ডকুমেন্টস স্বাক্ষর করার জন্য নিয়ে যেতে হয় ব্যারিস্টার কলেজ সংলগ্ন তার ব্যক্তিগত অফিসে। এছাড়া নিয়ম না থাকলেও ওয়ার্ডের সকল কার্যক্রম এলাকার কিছু সুবিধাভোগীদের হাতে (মনোনীত মেম্বার) ছেড়ে দিয়ে দায় সারছেন তিনি । বিচার-আচার, জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু ও ওয়ারিশ সনদ ও জাতীয়তা সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজও নিয়ন্ত্রণ করছেন এসব সুবিধাভোগী মনোনীত ব্যক্তিরাই। এই সুযোগে সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে তারা আদায় করছেন অনৈতিক সুবিধা।

স্থানীয়রা আরও জানায়, চসিকের ৩৯ নং ওয়ার্ডের সবকিছুই চলে সেলিম প্রকাশ তিন টিক্কা সেলিমের ইশারায়। বিতর্কিত ওয়ার্ড যুবলীগের এই সেক্রেটারি প্রায়শ্চই ওয়ার্ড কাউন্সিলরের চেয়ারে বসে কাজ তদারকি করেন। ওয়ার্ড অফিসের সালিশ—বিচার, জন্ম নিবন্ধন, মৃত্যু ও ওয়ারিশ সনদ প্রদানসহ সবই চলে তার ইশারায়। সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে আদায় করা হয় অতিরিক্ত অবৈধ অর্থ। এসব কাজে সেলিম প্রকাশ তিন টিক্কা সেলিমের নেতৃত্বে রয়েছে লোকমান, হারুনুর রশিদ ও নেছার আহমেদ আজিজকে নিয়ে আলাদা একটি সিন্ডিকেট। এরা সবাই কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমনের মনোনীত মেম্বার বলে জানান স্থানীয়রা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চসিকের ৩৯ ওয়ার্ডে টানা দুইবারের নিবার্চিত কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন। তিনি ওয়ার্ড যুবলীগেরও সভাপতি। জনগণের ভোটে নিবার্চিত হলেও জনসেবায় নেই তিনি। কিছু সামাজিক অনুষ্ঠান ও ব্যক্তিগত অফিস ছাড়া তার দেখা পাওয়া দুস্কর। সেখানেও তার দেখা মেলে দুপুর আড়াইটার পর। বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তিনি অবস্থান করেন ব্যারিস্টার কলেজ গেটের পাশে রেশমি ক্লাব সংলগ্ন ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক অফিসে। কাউন্সিলর সুমনের মুঠোফোনে সারাদিন চালু থাকলেও দুপুর আড়াইটার আগ পর্যন্ত কোনভাবেই সাড়া পাওয়া মুশকিল। ভোর রাত থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত তিনি ঘুমে কাটান বলে জানায় এলাকাবাসী।

অনুসন্ধানে জানা যায়, চসিকের প্রতিটি ওয়ার্ডে সেবা কার্যক্রম কাউন্সিলর ও ওয়ার্ড অফিস কেন্দ্রিক হলেও ৩৯ নং ওয়ার্ডের ক্ষেত্রে তা একেবারেই ভিন্ন। বিচার—আচার, জন্ম ও মৃত্যু সনদ এবং ওয়ারিশ সনদ প্রদানে শনাক্তকরণসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি কাজ করেন কাউন্সিলর মনোনিত ব্যক্তিরা। এদের মধ্যে আছেন, সেলিম প্রকাশ ‘তিন টিক্কা সেলিম’, লোকমান, হারুনুর রশিদ, নেছার আহমেদ আজিজ, ফরিদুল আলম, মোতাহের ও আব্দু রউফসহ আরও কয়েকজন। ওয়ার্ডের প্রতিটি অঞ্চলে এসব ব্যক্তিরাই কাউন্সিলরের কার্য-সম্পাদন করেন। কাউন্সিলর ওয়ার্ড অফিসে না আসা এবং দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ঘুমে থাকার কারণে প্রতিনিয়ত বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন সেবা প্রার্থীরা। শুধু তা নয় অভিযোগ আছে-জন্ম নিবন্ধন, ওয়ারিশ সনদ ও সেবা গ্রাহকদের কাগজপত্রসহ ওয়ার্ডের প্রয়োজনীয় সকল কাগজ ব্যক্তিগত অফিসে বসে স্বাক্ষর করেন কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন। এক্ষেত্রে ওয়ার্ডের কর্মচারীদের গিয়ে এসব কাগজে স্বাক্ষর করে আনতে হয়।

এছাড়াও ওয়ার্ড অফিসের বাইরে ব্যারিস্টার কলেজ এলাকায় কাউন্সিলরের চাচা খ্যাত হিরু নামের এক ব্যক্তিকে দিয়ে সেবাগ্রহীতাদের জাতীয়তা সনদ সরবরাহ করেন। আর তার এ মনোনীত ব্যক্তি প্রতি জাতীয়তা সনদের জন্য অবৈধভাবে ৫০ থেকে ১০০ টাকা করে নেয় বলে সিটিজিনিউজের অনুসন্ধানে ওঠে আসে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কাজিরগলি এলাকার একজন বাসিন্দা জানান, জনগণের নিবার্চিত হলেও কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন শুধুমাত্র স্বাক্ষর করা ছাড়া দৃশ্যত ওয়ার্ডের আর কোনো কাজই করেন না। যেকোন সেবা নিতে গেলে সেলিম সিন্ডিকেটকে টাকা দিতে হয়। আমার ছেলে-মেয়ের জন্ম নিবন্ধনের জন্য দু’মাস আগে অনলাইনে আবেদন করেছি। ওয়ার্ড অফিসে বারবার গিয়েও তা এখনো পাইনি। আমি দেখেছি, স্থানীয় না হলে প্রতি জন্ম নিবন্ধনে সেলিম প্রকাশ তিনটিক্কা সেলিম সিন্ডিকেট হাজার টাকা করে আদায় করছেন। ওয়ারিশ সনদ ও বিচার-আচারে ব্যাপক অনিয়ম হচ্ছে। এক্ষেত্রে কেউ কিছু বলতে পাচ্ছে না।

ওয়ার্ড অফিসে যান না এমন অভিযোগ অস্বীকার করে চসিকের ৩৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর জিয়াউল হক সুমন (২১এপ্রিল-২০২২) সিটিজি নিউজকে বলেন, “আমি প্রায় ওয়ার্ড অফিসে গিয়ে কাজের তদারকি করি। সালিশ—বিচার মনোনিত মেম্বাররাই করেন। তাদের কোন অনিয়ম অভিযোগ আমি পাইনি। আপনার জানামতে কেউ থাকলে আমার কাছে পাঠান।”

তিনি আরও বলেন, প্রতিটি জন্ম নিবন্ধনে ৫০টাকা করে সরকারি ফি নেয়া হচ্ছে। এর বেশি কারও থেকে নেয়া হচ্ছেনা। লোক সংকটের কারণে দেয়ার ক্ষেত্রে হয়তো বিলম্ব হতে পারে। কারণ, সম্প্রতি ওয়ার্ডের এক কর্মচারী বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মারা গেছেন। এখন সাকিল ও বাবর জন্ম নিবন্ধনের বিষয়ে দেখাশোনা করেন।

চাচা হিরুর মাধ্যমে জাতীয়তা সনদ সরবরাহ করার কথা স্বীকার করে কাউন্সিলর বলেন, লোকজনের সুবিধার জন্য আমি উনাকে ৬ হাজার টাকা বেতন দিয়ে রেখেছি। উনি ৫০/১০০টাকা নেয়ার কথা সঠিক নয়। খুশি করে কেউ যদি ২০/৩০ টাকা দেয় তাতে সমস্যা আছে? এতে সমস্যা থাকলে আমি বন্ধ করে দিতে পারি।

এনইউএস/জেইউএস/এসএম/এমজে

Advertisement

CTG NEWS