ঘুরে এলাম কাপ্তাই!

289
 মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া |  রবিবার, মার্চ ৬, ২০২২ |  ৫:৫৭ অপরাহ্ণ
কাপ্তাই
       
Advertisement

ভ্রমণ শব্দটির মধ্যেই ভালোলাগা কাজ করে, প্রশান্তি এনে দেয় মনে। তার ওপর লেকের স্বচ্ছ জলরাশির সাথে দিগন্তের মিতালি; পাহাড়ের গা বেয়ে বেড়ে উঠা সবুজ গাছগাছালির ছাঁয়া-প্রকৃতির বর্ণিল রঙে নিজকে রাঙানোর এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় কে?

ব্যস্ততার এ নগর জীবনে যেখানে দম ফেলার ফুসরত নেই, সেখানে আয়োজন করে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ার আশা দূরাশার সামিল। কিন্তু কথায় আছে যদি থাকে নসিবে আপনি আপনি আসিবে- তেমন একটা সুযোগ পেয়ে গেলাম কাপ্তাই ভ্রমণের। তাই তো আর দেরি না করে বেরিয়ে পড়া।

Advertisement

আমন্ত্রণটা পেয়েছিলাম সরকারি কর্মাস কলেজ বিএনসিসি প্লাটুনের পিইউও আবুল হাসনাতের কাছ থেকে। তো আর দেরি কিসের? আপনাদের শোনায় আমার কাপ্তাই ভ্রমণের রোমাঞ্চকর কাহিনী।

কাপ্তাই সম্পর্কে অল্প কিছু তথ্য দিয়ে রাখি। কৃত্রিম নীল পানির কাপ্তাই লেকের আয়তন প্রায় ১১ হাজার বর্গ কিলোমিটার। ইংরেজরা ১৯০৬ সালে প্রথম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পরিকল্পনা করে কাপ্তাইয়ে। তারপর আমেরিকার অর্থায়নে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কাপ্তাই বাঁধ তৈরি কাজ শুরু করেন।

১৯৬০ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। নির্মাণের পর পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের পানি সংরক্ষণের জন্য বাঁধ নির্মাণের ফলে নিম্নাঞ্চল ডুবে যায়। সৃষ্টি হয় হৃদের। এই হ্রদের সর্বনিম্ন গভীরতা ৩০ ফুট এবং প্রায় ১০০ ফুট পর্যন্ত। বলা আছে কাপ্তাই হ্রদটি ৯০ বছরের মধ্যে ভরাট হয়ে যাবে। ইংরেজি এইচ বর্ণের আকৃতি বিশিষ্ট কাপ্তাই লেক এর দুটি বাহু রয়েছে। সুভলং এর কাছে গিরিসঙ্কট দ্বারা সংযুক্ত যা কর্ণফুলী নদী পথের অংশ।

কাপ্তাই হ্রদের ডান বাহু বা কাসালং দক্ষিণ দিকে দুটি আন্তপ্রবাহী নদী মাইনি ও কসালং দ্বারা এবং পাশ দিয়ে কর্ণফুলী নদী দ্বারা আবর্তিত।  রাঙামাটি-কাপ্তাই অর্থাৎ বাম বাহুটি দুটি নদী দ্বারা বেষ্ঠিত। উত্তরে চেঙ্গি বা চিংরি দক্ষিণে রাইন খিয়াং।

মূলত রাঙ্গামাটি শহরের সৌন্দর্য ও পর্যটন নগরী হয়ে ওঠার কারণ কাপ্তাই লেক। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের নিদর্শন কাপ্তাই লেক, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে নিয়ে গেছে অনন্য উচ্চতায় । কাপ্তাই লেক ঘেঁষেই রাঙ্গামাটির পথে রাস্তা এগিয়েছে বলেই কাপ্তাই ও রাঙ্গামাটি একসাথে ভ্রমণ করার দারুন সুজোগ রয়েছে ।

তারিখটা ছিলো বাংলা ১১ ফাল্গুন, ২৪ ফেব্রুয়ারি।  সকাল সাড়ে ৭ টা।  শীত বিদায় নিলেও প্রকৃতিতে তার রেশ এখনো বিদ্যামান, শীত আর উষ্ণতার মাখামাখিতে মনোমুগ্ধকর এক সকাল। সবার চোঁখেমুখে সীমাহীন উত্তেজনা।
সরকারি কমার্স কলেজ শুরু হয় আমাদের যাত্রা। বিএনসিসি প্লাটুন আয়োজিত শিক্ষা সফর। বাসে ইতোমধ্যে আসন গ্রহণ করেছেন সরকারি কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ সুসেন কুমার বড়ুয়া এবং তারঁ পরিবার, শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহিম, ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক আবুল হাসনাত, বাংলা বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মো. এহতেশাম-উল হক, এবং এক্স ক্যাডেট এসোসিয়েশনের উপদেষ্টা ও কমার্স কলেজের প্রত্যবেক্ষণ আমি মোহাম্মদ সেলিম ভূঁইয়া এবং ৩৬ জন রানিং ক্যাডেট।

আড্ডা,গান,নাচে আমরা কখন যে প্রশান্তি পার্কে এসে পৌছাই। প্রশান্তি পার্কেই আমরা সকালের নাস্তা করি। কাপ্তাইয়ের মধ্যে এটি খুব সুন্দর ও ভাল মানের রিসোর্ট। কাপ্তাই সড়ক ঘেঁষে গড়ে উঠা প্রশান্তি পার্ক। পাশে কর্ণফুলী নদী এবং উঁচু পাহাড়। মানসম্মত খাবার, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে এবং ব্যবস্হাপনা সব মিলিয়ে খুব ভালো একটি পার্ক এটি।

প্রশান্তি পার্ক থেকে আমরা ওয়াগ্গা ইউনিয়নের বৌদ্ধ মন্দির, কাপ্তাইয়ের সুইডিশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট পার হয়ে আমাদের পূর্বের আমন্ত্রণ সিডিউল অনুযায়ী কাপ্তাই বিএন স্কুল এন্ড কলেজের উপাধ্যক্ষ এবং নেভাল ইউনের পিইউও মো. জাহানঙ্গীর আলমের আমন্ত্রণে বিএন স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ কমান্ডার এম নূরে আলম সিদ্দিকী, বি এন স্যারের সাথে সৌজন্য স্বাক্ষাৎ করি।

পরে মাওরুম বোর্টে (৪০ ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এবং ৪টি কেবিন সংযুক্ত) কাপ্তাইয়ের পাহাড় আর কৃত্রিম হ্রদে ভেসে ভেসে প্রাকৃতিক লীলাভূমির সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকি। মাঝপথে বেড়াইন্নার লেক থেকে দুপুরের খাবার সংগ্রহ করে নিই। কারণ বোটেই দুপুরের খাবার খেতে হবে।

নানিয়ার চরের বুড়িঘাটে কাপ্তাই লেকের ছোট্ট এক দ্বীপে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বাঙ্গালির অন্যতম এক বীর সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ। অথৈ নীল জল পরিবেষ্টিত সমাধিতে লেখা “তুমি দুর্জয়, নির্ভীক মৃত্যুহীন এক প্রাণ” কথাগুলো যেন তাঁর গৌরবৌজ্জ্বল বীরত্বের এক অনন্য প্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধের এই বীরশ্রেষ্ঠের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পরিবার-পরিজন নিয়ে আপনিও ঘুরে আসতে পারেন মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধিতে।

অথবা আপনার সন্তান বা নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সেই ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলেও আপনার গন্তব্য হতে পারে নানিয়ার চর। ১৯৯৬ সালে স্হানটি চিহ্নিত করা হয় এবং ২০০৬ সালে বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের আত্মত্যাগের প্রতি প্রদ্ধা জানিয়ে নির্মাণ করা হয় মার্চ রাইফেল ভাস্কর্য ।

বেড়াইন্নার লেক থেকে আসাম বস্তি, তবলছড়ি, ডিসি বাংলো রিজার্ভ বাজার এলাকার সৌন্দর্য দেখতে কি যে ভাল লাগছে এ অনুভূতি লিখে বুঝানো যাবেনা। একবার ভাবুন আমরা বোর্ট থেকে পুরো রাঙামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কাপ্তাই লেকের ঝর্ণা ধারা আর পানির বুকে বয়ে চলা নৌকা গুলোর দৃশ্য দেখে হারিয়ে যাচ্ছিলাম যেন এক অজানা স্বর্গীয় আনন্দে।

লেকের পানিতে নৌকায় চড়ে যত দূর এগিয়ে যাই প্রতি মুহূর্তে যেন চোখের সামনেই পালটে যাচ্ছে দৃশ্যপট, দেখতে দেখতে এক সময় মনে হচ্ছিলো বিশ্বের সৌন্দর্যের রানী খ্যাত কাশ্মীর এর কোন দর্শনীয় স্থান উপভোগ করছি। নীল জলরাশির মধ্যে দুলতে দুলতে চলা নৌকা আর শীতল বাতাস জন্ম দিবে অন্যরকম অনুভূতি আর চমৎকার রোমান্টিক দৃশ্য ।

উপভোগের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয় র্যাফেল ড্র এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল গান, আবৃত্তি একক ও দলীয় নৃত্য, ফ্যাশন শো।

ক্যাডেটদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রাণবন্ত হয়ে উঠে। ফাতেমা-তুজ-জোহরা, ক্যাডেট সীমান্ত দাস (সর্বত মঙ্গল রাধে) ক্যাডেট হৃদিতা বড়ুয়া (উত্তল পেগে মেঘে), ফাতেমা তুজ জোহরা (সোনা বন্ধু রে) মেয়েদের মিশ্র নাচে মেহেরুন্নেছা, ফাতেমা, মারজিয়া আলাম, সাদিয়া আফরিন, হৃদিতা বড়ুয়া (আবার এল যে সন্ধ্যা) । আবৃত্তিতে ক্যাডেট অলোক শাহ (লিচু চোর কবিতা) দলীয় নাচে মুনতাসির কিবরিয়া, কারিমুল মাওলা সাকিব, শাহরিয়ার সিয়াম, রাহাত হোসেন। ফ্যাশন শোতে মারজাহান আক্তার, নাসরিন ফারজানা, মারজিয়া আলাম, সাদিয়া আফরিন, জান্নাতুল ফেরদৌস, ঈশিতা রাহাত হোসেন অরুপ বড়ুয়া, কারিমুল মওলা অংশ নেয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালনায় ছিল মুহাম্মদ মুনতাসির কিবরিয়া এবং মুমতাহিন সুলতানা।

ফেরার সময় বারবার মনে হচ্ছিলো সময় এতো তাড়াতাড়ি কেন শেষ হয়। দিনভর এতো বেশী উপভোগ করেছি যে স্মৃতির আয়নায় সারা জীবন ভেসে উঠবে ভ্রমণ ।

জেইউএস

Advertisement

CTG NEWS