‘কথা রাখলেন না’ মেয়র রেজাউল

677
 নিজস্ব প্রতিবেদক |  বুধবার, জানুয়ারি ৫, ২০২২ |  ৪:২৭ অপরাহ্ণ
       
Advertisement

* গৃহকর বাড়ানোর উদ্যোগ

* অনুমতি চেয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি

Advertisement

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালনে এক বছর পূরণ না হতেই সাবেক মেয়রের পথে হাটতে যাচ্ছেন রেজাউল করিম চৌধুরী। নিয়েছেন ব্যক্তিমালিকানাধীন এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের গৃহকর বাড়ানোর উদ্যোগ। যদিও নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি নির্বাচিত হলে কর বাড়াবেন না। ইতোমধ্যে এ সংক্রান্ত অনুমতি চেয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়েছে।

সিটি করপোরেশনের পঞ্চম সাধারণ সভায় সভাপতির বক্তব্যে মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেছিলেন, নতুনভাবে করহার বৃদ্ধি হবে না। কর আদায়ের আওতা ও পরিধি বাড়ানো হবে। কোনো ভবন যদি দুই তলা থাকা অবস্থায় যে কর দিত এখন যদি তিন তলা, চার তলা বা বহুতল হয়ে যায় তা হলে বর্ধিত অংশের জন্য কর ধার্য কোনোভাবে অযৌক্তিক হয় না। চসিককে নগরবাসীর কর দিয়ে চলতে হয় কিন্তু এই আয় দিয়ে সেবার পরিধি বাড়ানো কিছুতেই সম্ভব নয়।

এর আগে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন দায়িত্বে থাকার সময় স্থাপনার ভাড়ার ভিত্তিতে পঞ্চবার্ষিকী গৃহকর পুনর্মূল্যায়ন করা হয়। এতে আগের তুলনায় গৃহকর কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ওই সময় এর বিরোধিতা করেছিলেন সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংগঠন। আন্দোলনের মুখে তা স্থগিত করে দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

পরে ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীকে দাপ্তরিক পত্র দেন চসিক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন। এতে তিনি স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন ২০০৯ এর ধারা ৮২ এর আলোকে সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ থেকে পুনর্মূল্যায়নকৃত কর আদায়ের অনুমোদন প্রদানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন।

তথ্যমতে, ১৯৮৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের আমলে তৈরি এ আইনটি প্রয়োগযোগ্য নয় বলেই তখন এটি প্রয়োগ করা হয়নি। বিএনপি সরকারের আমলে মীর মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন মেয়র থাকাকালে তিনিও সেটি প্রয়োগ করেননি। এরপর নির্বাচিত মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘ ১৭ বছর মেয়র ছিলেন। তিনিও প্রয়োগ করেননি। কারণ আইনটি প্রয়োগযোগ্য নয়। মেয়র এম মনজুর আলম হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ালে সেটি ছিল সহনীয় পর্যায়ে। নগরবাসী তা মেনে নিয়েছিল।

চসিকের রাজস্ব শাখা সূত্রে জানা গেছে, পৌরকর নির্ধারণে চসিক ২০১৬ সালের ২০ মার্চ প্রথম দফায় নগরীর ১১টি ওয়ার্ডে ‘এসেসমেন্ট’ শুরু করে এবং একই বছরের ২০ জুন শেষ হয়। দ্বিতীয় দফায় ২০১৬ সালের ১৮ অক্টোবর অবশিষ্ট ৩০টি ওয়ার্ডে ‘এসেসমেন্ট’ শুরু করে এবং তা শেষ হয়েছে ২০১৭ সালের ১৫ জানুয়ারি। পঞ্চবার্ষিকী কর পুনর্মূল্যায়ন শেষে তা ২০১৭ সালের ৩১ আগস্ট জনসম্মুখে প্রকাশ করা হয়। এর পর ফুঁসে উঠে ভবন মালিকেরা।

বিশিষ্টজনদের মতে, ১৯৮৬ সালের ‘দ্য সিটি করপোরেশন ট্যাক্সেশন রুলস’ অধ্যাদেশটি জারি করা হয়েছিল দেশের তদানীন্তন চারটি সিটি করপোরেশন—ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহীর জন্য। অধ্যাদেশ জারির ৩৫ বছর পার হয়ে গেলেও দেশের রাজধানী ঢাকাসহ কোনো নগরেই ওই অধ্যাদেশে নির্দেশিত বাড়িভাড়ার আয়ের ভিত্তিতে গৃহকর নির্ধারণের ব্যবস্থা বাস্তবায়িত করা যায়নি। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের মেয়াদকালে কোনো মন্ত্রী বা আমলার উর্বর মস্তিষ্ক থেকে হয়তো বাড়িভাড়ার ভিত্তিতে হোল্ডিং ট্যাক্স বা গৃহকর নির্ধারণের এই ভুল অধ্যাদেশের ধারণার জন্ম হয়েছিল, যা বিশ্বের আর কোথাও চালু নেই। কারণ, বাড়িভাড়া হলো বাড়ির মালিকের আয়, যার ভিত্তিতে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে নিয়মমাফিক প্রতিবছর আয়কর পরিশোধ করতে বাধ্য। ওই একই বাড়িভাড়ার আয়ের ভিত্তিতে যদি তাকে আবার গৃহকর দিতে হয়, তাহলে তো আয়ের ওপর ‘ডাবল ট্যাক্সেশন’ হয়ে যাবে, যা সর্বস্বীকৃত করনীতির পরিপন্থী বিধায় বিশ্বের সব দেশেই নিষিদ্ধ।

এদিকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সিটি কর্পোরেশনসমূহের (কর) বিধি ১৯৮৬ এর ২১ নম্বর বিধিমতে প্রতি পাঁচ বছর পর কায়িক অনুসন্ধানের মাধ্যমে গৃহকর পুনঃমূল্যায়নের এখতিয়ার সিটি কর্পোরেশনসমূহকে দেয়া হয়েছে। সে মতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টার হতে চসিক নতুন পঞ্চবার্ষিক কর পুনঃমূল্যায়নের উপর দায়েরকৃত আপিলসমূহ নিষ্পত্তিক্রমে কর আদায়ের প্রাক্কালে বিভিন্ন মহলের বিরোধিতার কারণে এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়। ২০২০ সালের ১৫ অক্টোবর শুধুমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পঞ্চবার্ষিক গৃহকর পুনঃমূল্যায়ন মোতাবেক কর আদায়ের অনুমতি দেয়ার পর ২০২০-২১ অর্থবছরের দ্বিতীয় কোয়ার্টার হতে কর আদায় করা হচ্ছে। কিন্তু স্থগিতাদেশ থাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন/ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম কোয়ার্টারে প্রকাশিত পঞ্চবার্ষিক কর পুনঃমূল্যায়ন বাস্তবায়ন করা যায়নি। চিঠিতে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের অনুরোধ জানানো হয়।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সিটি মেয়র এম রেজাউল করিম চৌধুরীকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

করদাতা সুরক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক হাসান মারুফ রুমী বলেন, যে আইনের ভিত্তিতে সিটি কর্পোরেশন হোল্ডিং ট্যাক্স নিতে চায় সেটি প্রয়োগযোগ্য নয়। সাবেক মেয়রও প্রয়োগ-অযোগ্য আইনটি প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়ে তীব্র আন্দোলনের মুখে পড়েন। বর্তমান মেয়র নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি নির্বাচিত হলে কর বাড়াবেন না। তিনি যদি আইনের দোহাই দিয়ে জনস্বার্থ বিরোধী কোন উদ্যোগ নেন তবে তাকেও তীব্র আন্দোলনের মুখোমুখী হতে হবে।

এসসি

Advertisement

CTG NEWS