উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব হলেন চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক ইলিয়াস হোসেন

367
 নিজস্ব প্রতিবেদক |  শুক্রবার, অক্টোবর ২৯, ২০২১ |  ৬:০০ অপরাহ্ণ
ইলিয়াস হোসেন
       
Advertisement

যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন চট্টগ্রামের সাবেক জেলা প্রশাসক এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন।

আজ ২৯ অক্টোবর, শুক্রবার রাষ্ট্রপতির আদেশ ক্রমে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ের উপসচিব এবিএম ইফতেখারুল ইসলাম খন্দকার। একই সাথে আরও ২০২ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

Advertisement

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন এর আগে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে প্রায় পৌনে তিন বছর দায়িত্বপালন করেছিলেন। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে থাকাকালীন সময়ে নাগরীক সুবিধা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে বেশ প্রশংসিত হয়েছিলেন ।

প্রায় অর্ধশত বছরের পুরানো প্রত্যন্ত একটি গ্রাম। বিদ্যুৎ, যানবাহন চলাচল করার মতো কোনো সড়ক ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি, বিদ্যালয়, খেলার মাঠ, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য সেবা বা ক্লিনিক কোনো কিছুরই সুবিধা ছিলোনা। চরম অবহেলিত আর অবজ্ঞার এমন একটি গ্রামকে সকল সুবিধার আওতায় এনে বদলে দিয়েছেন একজন সত্যিকারের সেবক। শুধুমাত্র পেশাদারিত্ব বা দায়িত্ববোধ নয় বরং মানবিকতাকে হৃদয়ে ধারণ করে কাজটি করেছেন তিনি। ইচ্ছা থাকলে যেকোনো ভালো কাজ কখনো বিফল হয় না সেটার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গ্রামে এসেছে বিদ্যুতের আলো, নির্মাণ হয়েছে স্কুল-মাঠ, ৫ কিলোমিটার মাটির সড়ক, খাওয়ার জন্য বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ চিকিৎসা সেবায় গড়ে দিয়েছেন কমিউনিটি ক্লিনিক। মাত্র বছরখানেক আগেও নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য কয়েক কিলোমিটার দূরের বাজারে যেতে হতো গ্রামবাসীকে এখন সেই গ্রামে বসছে হাট, হাতের নাগালে কেনাবেচার ব্যবস্থা। একজন দক্ষ প্রশাসকের আন্তরিকতায় বদলেছিলেন সবি-পূর্ণতায় শূন্যতা ঢেকে গিয়ে সেই গ্রামে শোভা পাচ্ছে নতুন এক চিত্র।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলা থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে দুর্গম পাহাড়ি এলাকার ‘মনাই ত্রিপুরা গ্রামের প্রায় ৫৫টি নৃ-গোষ্ঠী পরিবারের ৩৫০জন সদস্যকে স্বস্তির বসতি গড়ে দিয়েছেন মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। মনাই ত্রিপুরা গ্রামের পরিবেশ ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নে অভূতপূর্ব অবদান রাখা মানুষটি নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন চট্টগ্রামের উন্নয়নে ।

শুধু মনাই ত্রিপুরা গ্রামের মানুষই নয়-  সাবেক এই জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন হালদা নদীকে ‘বঙ্গবন্ধু হেরিটেজ’ রূপ দিতে কাজ করেছেন দিনের পর দিন। যার কারণে হাসি ফুটেছে হালদা পাড়ের মানুষের মুখে। উপকৃত হয়েছেন মৎস্যজীবীরা। চলতি বছর সর্বকালের রেকর্ড ছাড়িয়ে রেণু উৎপাদন হয়েছে এই হালদা নদীতে।

বিদ্যালয় ও শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছেন তিনি। স্কুলের পরিবেশ ও পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রবর্তন করে শত বছর চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন ডিসি ইলিয়াস হোসেন।

চট্টগ্রামে প্রাথমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত পরিদর্শনসহ মা সমাবেশের আয়োজন, জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল চালু, খেলনা সামগ্রীসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, নৈতিকতা শিক্ষা ডায়েরির প্রচলনসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। যার ফলশ্রুতিতে প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০১৯ এ বিভাগীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম বিভাগের শ্রেষ্ঠ জেলা প্রশাসক নির্বাচিত হন।

ইলিয়াস হোসেনের প্রচেষ্টায় জমি সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা ‘বঙ্গবন্ধু টানেল’, কক্সবাজার রেল লাইন ও বে-টার্মিনাল নির্মাণে জমি সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়েছে। শুধু সমস্যা সমাধান করেই পেশাগত দায় সারার স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পারতেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস। কিন্তু তা না করে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা করেছেন মানবতার সেবক হয়ে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনের নেতৃত্বে তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন অবেক্ষণ (সুপারভিশন) ও পরিবীক্ষণ জেলা কমিটির সফলতার সাথে কাজ করেছে। জেলা প্রশাসন, চট্টগ্রাম ২০১৯ সালে তথ্য প্রাপ্তির জন্য গৃহীত আবেদনের শতভাগ তথ্য প্রদান করতে সমর্থ হয়। পাশাপাশি তথ্য অধিকার বিষয়ে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সেবা সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেন।

আর্ন্তজাতিক তথ্য অধিকার দিবস-২০১৯ এর ‘তথ্য অধিকার আইন ২০০৯’ বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনের নেতৃত্বে (সুপারভিশন) জেলা কমিটি তথ্য অধিকার পুরস্কার লাভ করে।

বর্ষায় পাহাড় ধ্বসের মৃত্যুঝুঁকি কমাতে বর্ষার আগেই প্রচারণা ও উচ্ছেদ অভিযানসহ নানামুখী উদ্যোগের কারণে পাহাড়ে ভূমি ধ্বসে প্রাণহানির ঘটনা কমেছে। জেলা প্রশাসন সূত্র জানা যায়, সরকারি বেসরকারি মালিকানাধীন ১৭ টি পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে তৈরি করা স্থাপনা উচ্ছেদে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয় গত তিন বছরে।

জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় ক্ষতিপূরণের চেক উত্তোলনে হয়রানি এবং অস্বচ্ছতার অভিযোগ ছিলো দীর্ঘদিনের। ক্ষতিপূরণের চেক হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সব ধরনের তথ্য সম্বলিত একটি ওয়েবসাইট তৈরির করেন তিনি। এ ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন ২০১৭ অনুযায়ী চট্টগ্রামে যে সব প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে তার বিস্তারিত ওয়েবসাইটে তুলে ধরেছেন তিনি।

জেলা প্রশাসন সূত্রে আরও জানা যায়, মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেনের নির্দেশনায় দেশের প্রথম জেলা হিসেবে আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স ডিজিটাল করার উদ্যোগ নেয় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। ফলশ্রুতিতে সনাতন পদ্ধতির লাইসেন্সের পরিবর্তে অস্ত্রের মালিকদের কাছে বিতরণ শুরু হয় স্মার্ট আর্মস লাইসেন্স কার্ড । এর ফলে ভুয়া এবং জাল অস্ত্রের লাইসেন্স তৈরির পথ বন্ধ হয়ে যায় । স্মার্ট আর্মস লাইসেন্স ছাড়াও স্মার্ট ডিলিং লাইসেন্সের মাধ্যমে জেলা প্রশাসনের প্রায় ১৭টি সেবা ডিজিটালাইজ করা হয়।

এক সময়ে ময়লার ভাগাড় হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাকে বদলে দিয়ে দৃষ্টিনন্দন করাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। যে কারণে ২০১৯ সালে জনপ্রশাসন পদক লাভ করেন তিনি। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার অবকাঠামোগত উন্নয়ন, সংস্কার, সাধারণ ও অবহেলিত দুঃস্থ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাণি বিষয়ক সচেতনতামূলক শিক্ষা কার্যক্রম, নতুন নতুন প্রাণি সংযোজন, সংরক্ষণ ও পর্যটন সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে পরিবেশ ও আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য তিনি এ পদকে ভূষিত হন।

মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই চট্টগ্রামের লাইফ লাইন হিসেবে খ্যাত কর্ণফুলী নদীর দুই তীরে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে জেলা প্রশাসন। এ সময় টানা অভিযান চালিয়ে ২৩০ টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ১০ একর সরকারি জমি উদ্ধারের পাশাপাশি কর্ণফুলী নদীর তীরের সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকা এবং ৫টি খালের মুখ দখলমুক্ত করা হয়।

পেশাগত দায়িত্বের বাইরে গিয়ে করোনা মহামারিতে অনন্য এক ইলিয়াস হোসেনকে দেখতে পেয়েছিল চট্টগ্রামের মানুষ। স্কাউট সদস্যদের সাথে নিয়ে রাতের আঁধারে বাড়ি বাড়ি ত্রাণ পৌঁছে দিয়েছেন তিনি। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে কোভিড হাসপাতাল ঘোষণা, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে আইসিও বেডের ব্যবস্থা, করোনা রোগীর চিকিৎসায় বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে সমন্বয় করাসহ রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের অনলাইন ভিত্তিক ‘হাসপাতাল বাতায়ন’ প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করে প্রশংসিত হয়েছে নগরজুড়ে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ‘হাসপাতাল তথ্য বাতায়ন’ হলো চট্টগ্রাম মহানগরীর সকল হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক তথ্যভাণ্ডারের অনলাইন ভিত্তিক একটি সিঙ্গেল প্ল্যাটফর্ম। যা হাসপাতাল-ক্লিনিকগুলো থেকে জনসাধারণের সেবা প্রাপ্তির একটি উপযুক্ত মাধ্যম। যার মাধ্যমে একটি সিঙ্গেল ড্যাশবোর্ড থেকে মহানগরের সকল হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্য সেবা বিষয়ক প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্যের মাঝে রয়েছে কোভিড ও নন-কোভিড হাসপাতালের সংখ্যা, প্রতিটি হাসপাতালে কোভিড ও নন-কোভিড রোগীদের জন্য সাধারণ বেড, কেবিন, সিসিইউ ও আইসিইউ, এইচডিইউ সংখ্যা, হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা সংখ্যা। এছাড়া এ বাতায়নের মাধ্যমে করোনা পরীক্ষার ফলাফল, অক্সিজেন ও অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সম্পর্কিত তথ্য এবং সেবা গ্র্রহীতাদের অভিযোগ ও পরামর্শ প্রদানের সুযোগ অন্যতম। হাসপাতালের তথ্য বাতায়ন সেবার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ‘ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড এ্যাওয়ার্ড-২০২০’ পান ডিসি ইলিয়াস হোসেন ।

২০১৮ সালের ৬ মার্চ চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেন মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। চট্টগ্রামে যোগ দেয়ার পর পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সমালোচনার চাইতে প্রশসংতিই হয়েছেন বেশি। পেশাগত দায়িত্ব আর মানবিকতা কোনটা প্রাধান্য দিয়েছেন এমন প্রশ্নের ইলিয়াস হোসেন বলেছিলেন, ‘প্রায় পৌনে তিন বছর হলো চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। দীর্ঘ এই সময়ে চট্টগ্রামের মানুষকে আমার পরিবারের সদস্য মনে করেই কাজ করেছি। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অংশীদার হওয়ার সুযোগ পেয়েছি।’

তিনি আরও বলেছিলেন, ‘‘পেশা’-এই শব্দটা বাদ দিলে আমি একজন মানুষ। মানুষের ভাব-আবেগ আমাকে স্পর্শ করে শিশিরের মতো। যে কারণে মানবিক বোধটা প্রচণ্ডরকম তাড়িত করে আমাকে। গত পৌনে তিন বছর এই দায়বোধ থেকেই চট্টগ্রামের মানুষের জন্য কাজ করেছি।’ যোগ করেন বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ এই কর্মকর্তা।

সাবেক ইলিয়াস হোসেন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটির ভিসি ড. অনুপম সেন বলেন, ডিসি ইলিয়াস সাহেব কর্মঠ ও অমায়িক একজন মানুষ। চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বপালনকালীন সময়ে অনেকগুলো কাজ করেছেন তিনি। যা তাকে চট্টগ্রামবাসীর কাছে স্মরণীয় করে রাখবে।

জেইউএস/

Advertisement

CTG NEWS