ফুটপাত লিজ দিয়ে চসিক’র ২৫৫টি দোকান, সেলামি তিন লাখ

ফুটপাতে চসিক’র উৎপাত!

775
 নেজাম উদ্দিন সোহান |  বুধবার, অক্টোবর ২৭, ২০২১ |  ৮:৩৪ অপরাহ্ণ
ফুটপাতে চসিক’র উৎপাত!
       
Advertisement

নগরীতে পথচারী চলাচলের জন্য নির্ধারিত ফুটপাত লিজ দিয়ে ২৫৫টি দোকান বরাদ্দের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) বিরুদ্ধে। বায়েজিদের টেক্সটাইল মোড়, শেরশাহ ও তারাগেট সড়কের দু’পাশে দোকান নির্মাণের তৈরির সরঞ্জামাদি এনেও রাখা হয়েছে। এসব দোকানের সেলামি বাবদ নেওয়া হচ্ছে গড়ে তিন লাখ টাকা।

অভিযোগ আছে, নগরীতে ফুটপাত দখলমুক্ত করে পথচারীদের নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য অভিযান পরিচালনা করছেন চসিক’র ভ্রাম্যমান আদালত। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার ঘন্টাখানেকের মধ্যে আবারও দখল হয়ে যায় ফুটপাত। তবে কোন শক্তির নেপথ্যে ফুটপাত দখলকারীরা ভ্রাম্যমান আদালতকে বৃদ্ধা আঙ্গুলি দেখিয়ে পূণরায় ফুটপাত দখল করে ব্যবসা চালায় তা এখনও অজানা। ফুটপাত দখলমুক্তের নামে অভিযান আইওয়াশ ছাড়া আর কিছুই নয়। ফুটপাতের ওপর প্রশাসনের নজরদারি থাকলেও তারা নীরব। টাকা পেলে ফুটপাতে ব্যবসাও জায়েজ হয়ে যায়। এবার ফুটপাত লিজ দিয়ে টাকা কামানোর পথ জায়েজ করে নিলো চসিক কর্তৃপক্ষ।

Advertisement

বিশ্বস্ত সুত্রে জানা গেছে , শেরশাহ রোড ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতি ও তারা গেট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির ব্যানারে শেরশাহ সড়কের উভয় পাশে ফুটপাতে ১০০, তারা গেট সড়কের উভয় পাশের ফুটপাতে ৯০ ও টেক্সটাইল মোড় থেকে চন্দ্রনগরমুখী সড়কের উভয় পাশে ৬৫টিসহ মোট ২৫৫টি দোকান নির্মাণ করা হবে। ফুটপাতের কোথাও ৮১ বর্গফুট, কোথাও ৭৫ বর্গফুট আবার কোথাও ৬০ বর্গফুট দোকান বরাদ্দ দেয়া হয়। এসব দোকানের সেলামি বাবদ গড়ে তিন লাখ টাকা করে নিচ্ছেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। সেলামির বাইরেও ব্যবসায়ীরা নিজেদের অর্থে ফুটপাতের দোকানঘরগুলো তৈরি করে নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে ২৫৫ জন দোকানদারের তালিকার কাজ শেষ হয়েছে। তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীরা টাকাও জমা দিয়ে দিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি আ জ ম নাছির উদ্দিন চসিকের মেয়র থাকাকালে টেক্সটাইল সড়কটির উভয় পাশের ফুটপাত দখলে ছিলো। এসময় এলাকার কয়েক লাখ মানুষ, স্কুল শিক্ষার্থী, মেডিকেল পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও ওই এলাকার গার্মেন্টস কর্মীরা মূল সড়ক দিয়ে যাতায়ত করতেন। প্রায় সময় দুর্ঘটনার কবলে পড়তেন তারা। তাই টেক্সটাইল মহল্লা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে সে সময়ের মেয়র আ.জ.ম নাছির উদ্দিনকে দরখাস্ত দেয়া হয়। তার কিছুদিন পর চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন চসিক’র প্রশাসক নিযুক্ত হলে তিনি ওই ফুটপাতকে দখলমুক্ত করেন। ভাসমান হকারদের উচ্ছেদ করে পথচারীদের চলাচলের সুবিধার্থে ফুটপাত নির্মাণ করেন। পরে রেজাউল করিম চৌধুরী চসিক’র মেয়র নির্বাচিত হলে ওই ফুটপাত লিজ দিয়ে দোকান বরাদ্ধ দেয়ার অপতৎপরতা শুরু করে।

যদিও ফুটপাতে দোকান লিজ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আগে যারা সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে ছিল, তারাই ফুটপাতের দোকানগুলো লিজ দিয়ে গেছেন। এখানে আইনের কিছু বিষয় আছে। ওখানে যে দোকান উঠছে, সেটা লিজ দিয়ে গেছেন তারা (আগে দায়িত্বে থাকারা)। এরকম অনেক ফুটপাত লিজ দিয়ে গেছে। আমি এগুলোর আইনগত প্রক্রিয়া বিচার বিশ্লেষণ করে ধীরে ধীরে পদক্ষেপ নেব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চসিক’র সাবেক প্রশাসক খোরেশেদ আলম সুজন সিটিজি নিউজকে জানান, “আমি দায়িত্বে থাকাকালে এসবস্থানে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হয়। উচ্ছেদকৃত ব্যবসায়ীরা ওই সময়ে দোকান বরাদ্দের জন্য চিঠি দিয়েছিল। আমরা তা দেইনি। যদি কেউ পূর্বে দায়িত্বে থাকাকালিন সময় লিজ দিয়ে গেছে বলে, সেটা ভুল। আমরা এবিষয়ে কোন স্বীদ্ধান্ত দিইনি।

টেক্সটাইল মহল্লা আওয়ামী লীগের সভাপতি শ্রী রণজিত পাল বলেন, এই ফুটপাত আমাদের অনেক কষ্টের ফসল। এই ফুটপাতের জন্য আমরা অনেকের কাছে ধরণা দিয়েছি। নির্মিত এই ফুটপাত দিয়ে ক্যান্টানমেন্ট, মেডিকেল কলেজ ও গার্মেন্টস কর্মীসহ কয়েক লাখ মানুষের দৈনিক যাতায়ত করে। শুনেছি ফুটপাতের উভয় পাশে ২০০ গজ করে মোট ৪০০ গজ ফুটপাত লিজ দিচ্ছে চসিক। এখানে ৬০টির মতো দোকান বরাদ্ধ দেয়া হবে। যদি ফুটপাতে দোকান নির্মাণ করা হয়, তাহলে পথচারীদের মূল সড়ক দিয়েই হাটতে হবে। এতে প্রতিনিয়তই ঘটবে দুর্ঘটনা।

এ বিষয়ে মহল্লা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, একটি অসাধু চক্র মেয়রকে প্রভাবিত করে ফুটপাতে দোকান নির্মাণ করার পায়তারা চালাচ্ছে। আমরা অনেকবার মেয়রকে বিষয়টি বুঝানোর চেষ্টা করেছি। এনিয়ে আমরা চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার, ডিসি, পুলিশ কমিশনার ও মেয়রসহ চসিকের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক চিঠি দিয়েছি। বর্তমান মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী এ বিষয়ে আমাদের আশ্বস্থ করলেও শুনছি ফুটপাত লিজ দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে অসাধু ব্যবসায়ীরা ফুটপাতে দোকান নির্মাণ করতে ইট-বালি নিয়ে এসেছে। এখানে ফুটপাতে দোকান বরাদ্দ দেয়া হলে এখানে প্রতিদিনই ঘটবে দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনার দায় চসিক নিবে কিনা এমন প্রশ্ন করেছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সালে খুরশেদুল আলম সুজন প্রশাসক থাকাকালে ওই সব এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। সেই সময় সড়কের উভয় পাশে দখলে থাকা ফুটপাত হকারমুক্ত করা হয়। ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি রেজাউল করিম চৌধুরী মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর উচ্ছেদ করা স্থানে ফুটপাতে দোকান বরাদ্দের সিদ্ধান্ত দেয় সিটি করপোরেশন। গত ৯ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, শেরশাহ, টেক্সটাইল মোড় ও তারা গেট উচ্ছেদকৃত ব্যবসায়ীদের পুণর্বাসন করার লক্ষ্যে ২০২১ সালের ৩১ জানুয়ারি নিন্মোক্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। চসিকের প্রকৌশল বিভাগ এসব জায়গা চিহ্নিত করেন। চিহ্নিত জায়গা এস্টেট শাখা থেকে বরাদ্দ দেওয়া হবে। ভাড়া আদায় করা হবে। দোকান মালিকগণ তাদের নিজস্ব খরচে দোকান নির্মাণ করবেন।

এ বিষয়ে জানতে স্থানীয় কাউন্সিলর মো. শাহেদ ইকবাল বাবুর মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

আজ ২৭ অক্টোবর, বুধবার দুপুরে সরেজমিনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কার্যালয়ে গেলে মেয়র রেজাউল করিম গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে আছেন বলে জানান। পরে চসিকের ভূমি কর্মকর্তা (এস্টেট অফিসার) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী অফিসে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার সচিব জানায়, কয়েকদিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত এই কর্মকর্তা। তিনি প্রতিবেদককে তার সাথে ফোনে কথা বলার পরামর্শ দেন।

একই দিন সন্ধ্যায় চসিকের ভূমি কর্মকর্তা (এস্টেট অফিসার) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।

এসসি

Advertisement

CTG NEWS