ফানুস কী, কার উদ্দেশ্যে উড়ানো

196
 নিজস্ব প্রতিবেদক |  বুধবার, অক্টোবর ২০, ২০২১ |  ৭:৪৪ অপরাহ্ণ
ফানুস কী, কার উদ্দেশ্যে উড়ানো
       
Advertisement

কেউ বলেন ফানুস বাতি। দেখতে ডোলের ন্যায় বলে কেউ বলেন, ডোলবাজি। কিন্তু বৌদ্ধ পরিভাষায় এর নাম হল ‘আকাশ প্রদীপ’। বাঁশের কাইম দিয়ে শৈল্পিক কাঠামো তৈরি করে তার উপর রঙ্গিন কাগজ ব্যবহার করে বিভিন্ন আকৃতি দান করে ফানুস তৈরি করা হয়।

ফানুস কোন বেলুন নয় যে যখন তখন যেনতেনভাবে ওড়ানো যাবে। বেলুন ওড়ানোর ক্ষেত্রে কোন কালাকাল নেই, সময় অসময় নেই। রীতি নীতি বা ধর্মীয় মন্ত্রের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ফানুসের ক্ষেত্রে পালনীয় অনেক বিধি বিধান আছে। ফানুসের সাথে জড়িয়ে আছে একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর আবেগ-অনুভূতি।

Advertisement

সাম্প্রতিক সময়ে যে কেউ যেনতেন ভাবে যখন তখন ফানুস ওড়াচ্ছেন। তাদের কাছে এটা কেবল বেলুন সর্বস্ব আনন্দ লাভের উপায় মাত্র। আবার অবৌদ্ধরা কারো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য এটা করেন বলে মনে করিনা। তাদের মনোযোগ থাকে আসলে আনন্দ লাভের দিকে। প্রবারণা পূর্ণিমা দিনে দেশব্যাপী বৌদ্ধদের সাথে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও মিলেমিশে ফানুস ওড়াতে দেখা যায়। এটা সম্প্রীতির ক্ষেত্রে ভাল দিক।

ধর্মীয় রীতি-নীতি মেনে প্রতি বছর বৌদ্ধ মন্দির, বৌদ্ধদের প্রতিটি ঘর থেকে ফানুস উড়ানোর মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা চুলামনিকে উদ্দেশ্য করে পুজো দেন। তাকে স্মরণ করে উড়ানো হয় ফানুস। এ দিনে গৌতম বুদ্ধ দুঃখমুক্তি লাভের দৃঢ় সংকল্পে রাজ্য, রাজত্ব, ভোগ বিলাস ধনকুম্ভ সবকিছু ত্যাগ করে সংসার পরিত্যাগ করেছিলেন শুভ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে। তিনি সারথি ছন্দককে সাথে নিয়ে অশ্ব কন্থকের পিঠে চড়ে অনোমা নদীর তীরে পৌঁছান। রাজ আবরণ সারথি ছন্দককে বুঝিয়ে দিয়ে তিনি সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করেন। তিনি ভাবলেন, আমি এখন সন্ন্যাসী, রাজকীয় বাহারি চুল কিবা প্রয়োজন। তরবারি দিয়ে চুলের গোছা কেটে নিলেন। মনে মনে অধিষ্ঠান করলেন ‘যদি বুদ্ধ হওয়ার মত পারমী আমার মধ্যে থেকে থাকে তাহলে উর্ধ্ব দিকে নিক্ষিপ্ত চুলের এই গোছা মাটিতে না পড়ে আকাশে স্থিত থাকুক। এই সংকল্প করে তিনি চুলের গোছা উপরের দিকে নিক্ষেপ করেন। আশ্চর্যের বিষয় হল একটা চুলও মাটিতে পড়ল না। বৌদ্ধধর্ম মতে স্বর্গের ইন্দ্ররাজা এই চুলগুলো হীরা, মণি মানিক্য খচিত স্বর্ণপাত্রে ধারণ করে তাবতিংস নামক স্বর্গে উক্ত কেশ ধাতু স্থাপন পূর্বক একটি চৈত্য নির্মাণ করেন এবং এই চৈত্যের নাম রাখা হয় চুলামনি চৈত্য। স্বর্গের দেবতারা এখনও উক্ত চুলামনি চৈত্যের পূজা করে থাকেন বলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস।

বৌদ্ধদের মতে, এই পুণ্যময় পূর্ণিমা তিথিতে মহামানব গৌতম বুদ্ধ তাবতিংস স্বর্গে মাতৃদেবীকে অভিধর্ম দেশনার পর ভারতের সাংকাশ্য নগরে অবতরণ করেন। মানবজাতির সুখ, শান্তি ও কল্যাণের লক্ষ্যে স্বধর্ম প্রচারের জন্য তিনি ভিক্ষু সংঘকে নির্দেশ দেন। একই দিনে তার তিন মাসের বর্ষাবাসের পরিসমাপ্তি ঘটে।

হাটহাজারীর বাসিন্দা ব্যবসায়ী সুজন বড়ুয়া বলেন, আমাদের মতো মর্ত্যের বুদ্ধভক্ত পূজারীরা তো স্বর্গে আরোহন করতে পারেন না। তাই তারা পরম শ্রদ্ধায় কাগুজে ফানুস তৈরি করে একটি বিশেষ দিনে ধর্মীয় রীতি নীতি মেনে চুলামনি চৈত্যকে পূজা করার উদ্দেশ্যে আকাশ প্রদীপ হিসেবে ফানুস বাতি উত্তোলন করে থাকেন। ধর্মীয় গাঁথা বা মন্ত্র পাঠ করে উৎসর্গ করে খালি পায়ে বৌদ্ধরা প্রদীপ বা বাতি হিসেবে ফানুস উড়িয়ে উক্ত চুলামনি চৈত্যকে বন্দনা জানান। বিশেষ করে বৌদ্ধ ভিক্ষুর দ্বারা মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে সাধু ধ্বনির সুরে সুরে ফানুস ওড়ানো হয়। যেই স্মৃতির উদ্দেশ্যে ফানুস ওড়ানো হয় সেই হিসেবে আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিনে ফানুস ওড়ানোর কথা। কিন্তু আষাঢ়ী পূর্ণিমাতে বৃষ্টি এবং আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় অনেক সময় ফানুস ওড়ানোর পরিবেশ এবং সুযোগ কোনটিই থাকে না। তাই দীর্ঘ তিন মাসব্যাপী বর্ষাব্রত পালন করার পর প্রবারণা পূর্ণিমা বা আশ্বিনী পূর্ণিমায় দিনে ফানুস ওড়ানো হয়।

এসসি

Advertisement

CTG NEWS