আল্লামা শফী ও বাবুনগরীর পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত আব্দুস ছালাম চাটগাঁমী

120
 মো. আবু শাহেদ, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি |  বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১ |  ১০:০১ পূর্বাহ্ণ
       

লাখো মুসল্লি ও ভক্তদের উপস্থিতিতে হাটহাজারী মাদ্রাসার সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত মহাপরিচালক মাওলানা আব্দুস সালাম চাটগাঁমীর জানাজা সম্পন্ন হয়েছে।

বুধবার (৮ সেপ্টেম্বর) রাত ১১টা ৬মিনিটে হাটহাজারী জেলা পরিষদ ডাক বাংলোতে অনুষ্ঠিত নামাজে জানাজার ইমামতি করেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর মাওলানা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী।

Advertisement

জানাজা শেষে হাটহাজারী মাদ্রাসার উত্তর মসজিদের বায়তুল আতিক জামে মসজিদ সংলগ্ন মাকাবারায়ে জামিয়া নামক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন আব্দুস সালাম চাটগাঁমী। যেখানে হাটহাজারী মাদ্রাসার সাবেক মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও হেফাজতের সাবেক আমীর আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীসহ হাটহাজারী মাদ্রাসার শীর্ষ আলেমদেরও দাফন করা হয়।

এদিকে মাওলানা আব্দুস ছালাম চাটগাঁমী মারা যাওয়ার খবর শুনে দেশের বিভিন্ন বিভাগ, জেলা-উপজেলা থেকে আসা ধর্মপ্রাণ লাখো ভক্ত ও মুসল্লি জানাজায় অংশ নেন।

জানা যায়, গতকাল বুধবার বেলা ১২টার সময় আব্দুস ছালাম চাটগাঁমীর মরদেহ বহনকারী এ্যাম্বুলেন্সটি তার দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হাটহাজারী মাদ্রাসায় পৌঁছে।

এর আগে লাখো লাখো জনতার উপস্থিতিতে পুরো হাটহাজারী সদর মুখর হয়ে ওঠে। তাছাড়া রাত ১০টা থেকে হাটহাজারী-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে দুইপাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। হাটহাজারী প্রবেশ মুখের রাঙামাটি সড়কসহ বিভিন্ন উপ-সড়কেও যান চলাচল দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। অনেকে পায়ে হেঁটে জানাজায় অংশ নেন। লাখো জনতার উপস্থিতিতে রাত সাড়ে ১০টায় হাটহাজারী মাদ্রাসা থেকে আব্দুস ছালামের লাশ বহনকারী এ্যাম্বুলেন্সটি মাদ্রাসা সংলগ্ন জেলা পরিষদ ডাক বাংলোর সামনে নিয়ে যাওয়া হয়।

এসময় তার লাখো ভক্তকে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায়। পরে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে রাত ১১টা ৬ মিনিটে নামাজ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

নামাজে জানাজার আগে বক্তব্য রাখেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর মাওলানা মহিবুল্লাহ বাবুনগরী, মহাসচিব মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদী, মাওলানা ইয়াহিয়া, মাওলানা আহমদিয়া, মাওলানা মাহমুদুল হাসান, মাওলানা আমিনুল শাহ, মাওলানা সালাউদ্দিন নানুপুরী এবং আব্দুস ছালাম চাটগাঁমীর ছেলে মাওলানা ইসহাক।

মাওলানা আব্দুস ছালাম দীর্ঘদিন মাদ্রাসার সিনিয়র শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আল্লামা শাহ আহমদ শফির ইন্তেকালের পর তিনি মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির প্যানেল মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

উল্লেখ্য, তিনি পাকিস্তানের জামেয়াতুল উলুম আল ইসলামিয়া বানূরী টাউন করাচির সাবেক প্রধান মুফতি, কওমি অঙ্গনের বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলূম হাটহাজারী মাদ্রাসার মুফতি ও মুহাদ্দিস ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশের গ্র্যান্ড মুফতিও ছিলেন।

মুফতি আব্দুস ছালাম ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানার নলদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের মাদ্রাসায় প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে বাবুনগর মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে পটিয়ার জিরি মাদ্রাসায় চার বছর পড়াশোনা শেষে দাওরায়ে হাদীস সমাপ্ত করেন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের উচ্চ শিক্ষার জন্য পাকিস্তানের বিখ্যাত জামেয়াতুল উলূম আল ইসলামিয়া আল্লামা বানূরী টাউন করাচিতে ভর্তি হন। সেখানে উচ্চতর হাদীস ও ফেকাহ নিয়ে পড়াশোনা করেন। ফিকাহ পড়াকালিন প্রচলিত ব্যবসায় স্বত্ব বিক্রি ও তাত্ত্বিক আলোচনা শিরোনামে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ তৈরি করেন। আল্লামা আব্দুর রশীদ নোমানী (রহ.) অভিসন্দর্ভটি পূর্ণ যাচাই-বাচাইয়ের পর মুমতাজ (ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট) সনদ প্রদান করেন। এছাড়াও মুফতি ওলি হাসান টুংকি (রহ.) নিজের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সনদ প্রদান করেন।

আব্দুস ছালাম পড়াশোনা শেষেই ওই জামেয়াতেই কার্যকরি মুফতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। মুফতি আজম ওলি হাসান টুংকির অসুস্থতার পর তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান মুফতির কাজ আঞ্জাম (আয়ব্যয়) দেন। তিনি মেধা ও যোগ্যতার মাধ্যমে নিজ অবস্থান ধরে রাখেন। মুফতি ওলি হাসান টুংকির ইন্তেকালের পর বিশ্ববিখ্যাত এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান মুফতি হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন।

আব্দুস ছালাম চাটগাঁমী পাকিস্তানের বানূরী টাউন করাচিতে দীর্ঘ ৩০বছর অবস্থানকালে প্রায় ৩ লাখ লিখিত ফতোয়া দিয়েছেন। যা জামেয়া বানূরী টাউন করাচির ইতিহাসে অনন্য মাইলফলক। বানূরী টাউনের দারুল ইফতায় ৬০ খণ্ড সম্বলিত রেজিস্ট্রি বইতে এসব সংরক্ষিত আছে। ফলে দেশের মাটি পেরিয়ে বিদেশেও মুফতি আব্দুস ছালাম চাটগাঁমী নামটি সমুজ্জ্বল।

তার ফতোয়া গ্রন্থের জগতে সাড়া জাগানো নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ ‘জাওয়াহিরুল ফাতওয়া’। আলোড়ন সৃষ্টিকারি এ গ্রন্থের মাকবুলিয়্যাত স্বয়ং রাসূল সা. এর মাধ্যমে স্বীকৃত। স্বপ্নের মাধ্যমে রাসূলে আরাবী সা. গ্রন্থটির প্রশংসা করেছেন! ‘জাওয়াহিরুল ফাতওয়া’র নতুন এডিশনে এ স্বপ্নের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

৪ খণ্ডের জাওয়াহিরুল ফাতওয়া ছাড়াও পাকিস্তানের করাচির শীর্ষ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বাংলাদেশী এ মহান লেখকের একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

তার লেখা রচনাবলীর মধ্যে রয়েছে- ১. জাওয়াহিরুল ফাতওয়া ৪ খণ্ডে প্রকাশিত। ৫ম ও ৬ষ্ঠ খণ্ড প্রকাশিতব্য (উর্দু), ২. আপকা সুওয়াল আওর উনকা জওয়াব আহাদীছ কি রৌশনি মেঁ (উর্দু), ৩. ইসলামী মায়িশাত কে বুনয়াদী উসূল (উর্দু), ৪. ইসলাম ও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানব অঙ্গের ক্রয়-বিক্রয় (বাংলায় অনূদিত), ৫. রহমতে আলম সা. এর মকবুল দোয়া (উর্দু-বাংলা), ৬. মুরাওয়াজা ইসলামী ব্যাংকারী (উর্দু), ৭. হায়াতে শায়খুল কুল, ৮. তাজকেরায়ে মুখলিছ, ৯. মাকালাতে চাটগাঁমী।

আব্দুস ছালাম চাটগাঁমী ২০০০ সালে স্বদেশের ভালোবাসা এবং দারুল উলূম হাটহাজারীর মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর আহ্বানে মুফতি আব্দুস ছালাম চাটগাঁমী বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ২০০১ সাল থেকে দারুল উলূম হাটহাজারীতে খেদমত শুরু করেন। মুফতি আব্দুস ছালাম চাটগাঁমী দারুল উলূম হাটহাজারীতে নিয়োগের পর ২ বছর মেয়াদি উচ্চতর উলূমুল হাদীছ বিভাগ চালু করা হয়। বিভাগটি ইতোমধ্যে হাদীস গবেষণায় নতুন নতুন অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।

যেভাবে বাংলাদেশের গ্র্যান্ড মুফতি

দেশে ফিরে হাটহাজারীতে নিয়োগের সময় বাংলাদেশের গ্র্যান্ড মুফতি ছিলেন আল্লামা আহমদুল হক রহ.। তার ইন্তেকালের পর আল্লামা চাটগাঁমীকে বাংলাদেশের ‘মুফতি আজম’ হিসেবে মনোনীত করা হয়। ‘বড় মনের’ মানুষ হিসেবে পরিচিত এ মহান মনীষী বিরতহীন ইসলামের খেদমত করে গেছেন।

আল্লামা আব্দুস ছালাম চাটগাঁমীর রয়েছে নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান। ২০০১ সালে চট্টগ্রাম শহরের চাক্তাইয়ে প্রতিষ্ঠা করেন দারুল ইফতা খাদেমুল কুরআস ওয়াস সুন্নাহ নামে ব্যতিক্রমধর্মি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে উচ্চতর ইসলামী আইন গবেষণা বিভাগ, উচ্চতর কেরাত ও হেফজ বিভাগ রয়েছে।

এফএম/এআই

Advertisement

CTG NEWS