হেলেনা জাহাঙ্গীরের মতো হাজারো হেলানা ওত পেতে বসে আছে দলে

‘পরগাছা’ অঙ্গসংগঠন নিয়ে বেকায়দায় আওয়ামী লীগ!

250
 জালালউদ্দিন সাগর |  রবিবার, জুলাই ২৫, ২০২১ |  ৬:০৭ অপরাহ্ণ
হেলেনা জাহাঙ্গীর
       

আওয়ামী লীগসহ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে গড়ে ওঠা অনুমোদনহীন ‘পরগাছা’ এসব সংগঠনের কারণে বিব্রত খোদ আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা। তাদের অভিমত- এসব ভুঁইফোঁড় সংগঠন নানাভাবে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করাসহ বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের ভাবমূর্তিতে কলংকের দাগ লেপন করছে। শুধু দেশই নয়, দেশের বাইরেও অস্তিত্বহীন এসব সংগঠনের নেতারা নিজেদের প্রচারণায় পোস্টার-ব্যানার, ফেসবুক, টুইটার, ওয়েব পেইজে ব্যবহার করছেন বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা এবং সজিব ওয়াজেদ জয়ের ছবি। এর মধ্যে কোনো কোনো সংগঠন নিজেদের আওয়ামী লীগের অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠন দাবি করে প্রচারণায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করছে। ভুঁইফোঁড় এসব সংগঠনের নেতাদের বিরুদ্ধে তদবির, অনিয়ম, চাঁদাবাজিসহ নানা ধরনের অভিযোগ বেশ পুরনো, যা বিতর্কিত করছে আওয়ামী লীগকে।

আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে স্বউদ্যোগে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামে সংগঠন করার কারণে গতকাল ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর দাবি শুধু হেলেনা জাহাঙ্গীর নয়, এই সংগঠনে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মতো হাজার সুবিধাবাদী ওঁত পেতে আছে। তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া জরুরী।

Advertisement

সুবিধাবাদী এসব সংগঠন ও সংগঠনের নেতা-কমীর্দের সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, সংগঠনের গঠনতন্ত্রেই বলা আছে, কোন কোন সংগঠন আওয়ামী লীগের অনুমোদিত সংগঠন। এর বাইরে অন্য কোনো সংগঠন করার সুযোগ নেই।

ভুঁইফোড় অস্তিত্বহীন এসব সংগঠনের সমর্থক ও নেতাদের সতর্ক করে আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বলেন, যারা জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী তারা কখনোই সংগঠনের গঠনতন্ত্রের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো সংগঠন সৃষ্টি বা সে সংগঠনে জড়িত হতে পারেন না। যারা এসব করেন তারা সুবিধাবাদী। আওয়ামী লীগের নাম বেচে ব্যক্তি স্বার্থহাসিল করাই তাদের কাজ।

তিনি আরও বলেন, যারা অননুমোদিত এসব সংগঠন গঠন করছেন এবং এর সাথে জড়িত হয়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাসহ সাংগঠনিক ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।
ইতোমধ্যে সজিব ওয়াজেদ জয়ের নামে একটি সংগঠন সৃষ্টি করার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে জানিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রিয় এই নেতা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের অনুমোদিত সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃ সংগঠনের বাইরে অন্য কোনো সংগঠন করার সুযোগ নাই।

বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের কোনো সদস্যের নামে কোনো সংগঠন করতে হলে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অনুমতি লাগবে বলেও জানান তিনি।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল বলেন, ভূঁইফোড় এসব সংগঠনগুলোকে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সবাই মিলে বয়কট করা উচিত। সবাই মিলে বয়কট করলে একসময় নিজেরাই অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। একই সাথে সুবিধাভোগী এসব সংগঠনের সাথে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরী।

জানা যায়, আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে স্বীকৃত আটটি সহযোগী ও তিনটি ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন রয়েছে। সহযোগী সাতটি সংগঠন হচ্ছে- আওয়ামী যুবলীগ, কৃষক লীগ, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, তাঁতী লীগ, যুব মহিলা লীগ, মৎস্যজীবী লীগ। ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠন তিনটি হচ্ছে- ছাত্রলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ।

এর বাইরে ভুঁইফোঁড় সংগঠনের নামে সারাদেশে আওয়ামী লীগের নাম ভাঙাচ্ছে সুবিধাবাদী সহস্রাধিক সংগঠন। এর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা মঞ্চ, আওয়ামী, বঙ্গবন্ধু, মুজিব, শেখ হাসিনা, জননেত্রী, দেশরত্ন, নৌকা, বঙ্গমাতা, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ রাসেল, সজিব ওয়াজেদ জয়, ডিজিটাল, মুক্তিযুদ্ধ কিংবা স্বাধীনতা এবং পরে ‘লীগ’ যুক্ত করে চলছে বহুমুখী প্রচারণা।

এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে- আওয়ামী প্রচার লীগ, পর্যটন লীগ, আওয়ামী সমবায় লীগ, আওয়ামী তৃণমূল লীগ, আওয়ামী ছিন্নমূল হকার্স লীগ, আওয়ামী তরুণ লীগ, আওয়ামী শিশু লীগ, আওয়ামী রিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, আওয়ামী যুব হকার্স লীগ, আওয়ামী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, আওয়ামী পরিবহন শ্রমিক লীগ, আওয়ামী নৌকার মাঝি শ্রমিক লীগ, আওয়ামী যুব সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী হকার্স ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন পরিষদ, বঙ্গবন্ধু গ্রামডাক্তার পরিষদ, বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু আদর্শ পরিষদ, বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরিষদ, আমরা মুজিব সেনা, মুজিব হব, চেতনায় মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক, বঙ্গমাতা পরিষদ, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিব পরিষদ, নৌকার সমর্থক গোষ্ঠী, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় লীগ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় সংসদ, দেশরত্ন পরিষদ, দেশীয় চিকিৎসক লীগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লীগ, আমরা নৌকার প্রজন্ম, নৌকার নতুন প্রজন্ম, ডিজিটাল আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, ডিজিটাল ছাত্রলীগ, আওয়ামী শিশু যুবক সাংস্কৃতিক জোট, তৃণমূল লীগ, একুশে আগস্ট ঘাতক নির্মূল কমিটি, রাসেল মেমোরিয়াল একাডেমি, জননেত্রী পরিষদ, দেশরত্ন পরিষদ, অভিভাবক লীগ, গণতন্ত্র রক্ষা পরিষদ লীগ, জনতার প্রত্যাশা লীগ, বঙ্গবন্ধু মানবকল্যাণ পরিষদ, ইতিহাস চর্চা লীগ, অধিকার আদায় লীগসহ আরও অনেক সংগঠন।

অভিযোগ রয়েছে অধিকাংশ সংগঠনের নেতারা নিজের নামে ভিজিটিং কার্ড ছাপিয়ে, সংগঠনের নামে তদবির, ধান্ধাবাজি, টেন্ডারবাজি, জবর-দখলসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত। এরা নিজেদের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা দাবি করে বিভিন্ন দফতরে সুবিধা আদায় ও নিজ নিজ এলাকায় ব্যাপক চাঁদাবাজি করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, দলের গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী আওয়ামী লীগের রয়েছে সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন এবং বিভিন্ন উপকমিটি। কিন্তু এসবের সুযোগ নিয়ে স্বীকৃত সংগঠনের বাইরে যেকোনো নামের সঙ্গে ‘লীগ’ বা ‘আওয়ামী’ শব্দ জুড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

আজ ২৫ জুলাই তার নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, দল ক্ষমতায় থাকলে নানান সুবিধাভোগী শ্রেণি এবং বসন্তের কোকিলরা এ ধরনের চেষ্টায় লিপ্ত হয়। এরা নানান আগাছা ও পরগাছা। দলীয় সভানেত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী দলের মধ্যে কারো প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে এ ধরনের কাজে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কেএন

Advertisement

CTG NEWS