২ মাসেও গতি ফেরাতে পারে নি পিবিআই

অর্থের ইন-আউটেই আটকে আছে মোর্শেদ আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা!

প্রকাশ্যে ঘুরলেও গ্রেফতার হয়নি এজাহারভুক্ত আসামীরা

530
 জালালউদ্দিন সাগর |  শনিবার, জুলাই ১৭, ২০২১ |  ৪:৫৭ অপরাহ্ণ
       

ব্যাংকার মোর্শেদ চৌধুরীর আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলা হওয়ার পর প্রায় সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ‘অর্থ’ সূত্রের মধ্যেই আটকে আছে মামলার তদন্তের গতি। যে অর্থ প্রদানের চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন মোর্শেদ, সে অর্থের ‘ইন-আউট’ সম্পর্কে পরিষ্কার না হয়ে মামলা নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে নারাজ তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের কর্মকর্তারা। পিবিআইয়ের অভিমত, ঘটনাটি যেহেতু অর্থ সংশ্লিষ্ট, সেহেতু এই অর্থের জোগান ও ব্যয়ের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছে তারা।

কিন্তু মামলার বাদী নিহত ব্যাংকার মোর্শেদ চৌধুরীর স্ত্রী ইশরাত জাহানের দাবি, টাকা কোথা থেকে এলো আর কীভাবে এবং কত শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে এই টাকা ব্যবসায় খাটানো হলো- এই বিষয়ের চেয়ে বেশি জরুরি- যাদের অনবরত ফোর্সের কারণে আমার স্বামী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হলেন তাদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা। এরপর তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই অর্থের সঠিক হিসাব বের হয়ে আসবে। মামলা সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে জ্ঞিাসাবাদ না করলে সঠিক তথ্য বের হয়ে আসবে না’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

Advertisement

উল্লেখ্য, ৭ এপ্রিল ভোরে নগরীর শিশু একাডেমি সংলগ্ন হিলভিউ আবাসিক এলাকায় নিজ বাসায় ফ্যানের সাথে দড়িতে ঝুলে আত্মহত্যা করেন ব্যাংকার আব্দুল মোর্শেদ চৌধুরী। ঘটনার পরদিন ৮ এপ্রিল নিহতের আপন ফুফাত ভাই চিটাগাং চেম্বারের সাবেক পরিচালক জাবেদ ইকবাল, তার ভাই পারভেজ ইকবাল এবং নাঈমউদ্দিন সাকিব, যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল হক চৌধুরী রাসেলকে আসামী করে আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা দায়ের করেন নিহতের স্ত্রী ইশরাত জাহান। পরে ১১ এপ্রিল নগর পুলিশের এক কর্মকর্তাসহ হুইপপুত্র নাজমুল হক শারুন চৌধুরী ও সাবেক ছাত্রনেতা আরশাদুল আলম বাচ্চুর বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

পরদিন ১২ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে মামলার ভার গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থাকার তথ্য পেয়ে মো.আরাফাত হোসেন নামে এক যুবককে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মাইনুর রহমান।

এরপর নগর গোয়েন্দা পুলিশের হাত ঘুরে গত ২০ মে মামলার তদন্তভার পিবিআইকে হস্তান্তর করেন বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইজি) ড. বেনজির আহমেদ। ২৭ মে মামলার ভার গ্রহণ করেন পিবিআইয়ের উপ-পরিদর্শক (এসআই) কামরুল।

বাদী ইশরাত জাহান বলেন, মোর্শেদ আত্মহত্যার মামলার প্রায় সাড়ে তিন মাস হতে চলেছে। গত দুইমাস ধরে এই মামলার তদন্ত করছে পিবিআই। তিনি আরও বলেন, আমরা ভেবেছিলাম পিবিআই দায়িত্ব নেওয়ার পর মামলা তদন্তে গতি আসবে। গ্রেফতার করা হবে অভিযুক্তদের। কিন্তু গত দুই মাসেও পিবিআই কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। আর আসামীদের গ্রেফতার করে জ্ঞিাসাবাদ না করলে সত্যটা বেরিয়ে আসবে না।

আসামীদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়ে স্বামী হারানো এই নারী আরও বলেন, আমি চাই না নিরপরাধ কেউ শাস্তি পাক। আমি শুধু চাই, আমার স্বামী যাদের কারণে আত্মহত্যা করেছে তারা আইনের আওতায় আসুক।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পিবিআই, চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পুলিশ সুপার নাইমা সুলতানা বলেন, গত ২৭ মে বৃহস্পতিবার মোর্শেদ চৌধুরী আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলাটির দায়িত্ব পায় পিবিআই। ঘটনাটি যেহেতু অর্থ সংশ্লিষ্ট, সেহেতু অর্থের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।

একই কথা বলেন, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিদর্শক কামরুল। তিনি বলেন, ঘটনাটি যেহেতু অর্থ সংশ্লিষ্ট সেহেতু অর্থের বিষয়ে তথ্যগুলো যোগাড় করতে একটু সময় লাগছে।

অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেন জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, ঘটনায় যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে শুধু তাদেরকেই গ্রেফতার করা হবে।

বাদী ইশরাত জাহানের অভিযোগ— ২০১০ সাল থেকে আপন ফুপাতো ভাইদের সাথে ব্যবসা করতে গিয়ে ধার নেওয়া টাকা পুরো পরিশোধ করার পরও দাবিকৃত অতিরিক্ত টাকার অব্যাহত চাপ সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন মোর্শেদ। ব্যবসায়িক পার্টনার না হওয়া সত্ত্বেও হুইপপুত্র শারুন চৌধুরী ও সাবেক ছাত্রনেতা আরশাদুল আলম বাচ্চুর অব্যাহত চাপ, হুমকি ও হামলা করেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, কোনো নথিপত্র ছাড়া তারা মোরশেদকে ২৫ কোটি টাকা ঋণ দেন। তিনিও তাদের ৩৫ কোটি টাকা শোধ করেন। ২০১৮ সালের দিকে এসে তিনি ওই ব্যবসার কথা পরিবারের অন্যদের জানান। এই ঘটনায় শারুন চৌধুরীর আবির্ভাব ২০১৯ সালের মে মাসে বলে উল্লেখ করেন ইশরাত জাহান। মে মাসের একদিন শারুন তার স্বামীকে (মোরশেদ চৌধুরী) ফোন করে রেডিসন হোটেলে দেখা করতে বলেন। মোরশেদ এতে আপত্তি করেন।

তিনি বলেন, শারুন চৌধুরীর সঙ্গে তার কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন নেই। তারপরও কেন তিনি দেখা করতে বলছেন। জবাবে শারুন চৌধুরী বলেন, ‘লেনদেন নেই, এখন হবে’। এর কিছুক্ষণ পরেই শারুন আরও ১০-১২ জন যুবককে নিয়ে তাদের বাসায় যান। ভিডিও ফুটেজে শারুনকে দেখা না গেলেও, মোরশেদের ফুপাতো ভাই পারভেজকে দেখা যায়। তাদের ভবনের নিরাপত্তারক্ষীদের আটকে রেখে ওই যুবকেরা বলে, গাড়ির ভেতরে শারুন চৌধুরী বসে আছেন। ওই সময় মোরশেদ চৌধুরী বাসায় ছিলেন না। তিনি তার আত্মীয় আজম খানের বাসায় ছিলেন। আজম খানই লেনদেনের বিষয়টি দেখভাল করছিলেন। তার অবস্থান জেনে কিছুক্ষণ পর শারুন চৌধুরীও হাজির হন আজম খানের বাসায়।

তিনি আরও বলেন, মোর্শেদ চৌধুরীর সঙ্গে শারুন চৌধুরীর সরাসরি কোনো ব্যবসায়িক লেনদেন না থাকলেও পারভেজ ইকবাল ও জাবেদ ইকবালের মাধ্যমে শারুন চৌধুরীর ব্যবসায় অর্থ বিনিয়োগ করেন বলে তিনি শুনেছেন। দেশজুড়ে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু হলে শারুন আত্মগোপনে যান, এরপর থেকে তিনি আর সরাসরি কোনো বৈঠকে হাজির হননি।

ইশরাত আরও বলেন, ২০১৮ সালে মোরশেদকে তার ফুপাতো ভাইয়েরা এম এম প্যালেসে আটকে রাখেন। তার মাথায় পিস্তল ঠেকান, পাসপোর্ট কেড়ে নেন এবং তাকেও নানাভাবে হেনস্তা করেন। ওই সময় পাঁচলাইশ থানায় মামলা করতে গেলেও পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে নগর পুলিশের উত্তর বিভাগের উপ কমিশনারের হস্তক্ষেপে পাঁচলাইশ থানায় মামলা নেন। ওই ঘটনায় মোরশেদের ফুপাতো ভাই জাবেদ ইকবাল গ্রেপ্তার হন। তিনি জামিনে বেরিয়ে আসার পর নগর পুলিশের সেই কর্মকর্তার কার্যালয়ে ডেকে নিয়ে একটি চুক্তিপত্রে সই করান। ওই চুক্তিপত্র অনুযায়ী মোরশেদকে ১২ কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। যদিও কেন এই টাকা দিতে হবে তা আমার বোধগম্য ছিল না।

কেএন

Advertisement