যার বিদায়ে কেঁদেছে হাটহাজারী!

829
 মো. আবু শাহেদ, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি |  বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৫, ২০২১ |  ৭:০৩ অপরাহ্ণ
যে বিদায়ে কেঁদেছে হাটহাজারী
       

তিনি একজন ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা)। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যক্তি। মানবিক ও কর্মবীর হিসেবে পরিচিত। নাম তার রুহুল আমিন। ইউএনও হিসেবে সর্বশেষ কর্মস্থল ছিলো চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায়। মাত্র দুই বছর ১০মাস সেবা করে হাটহাজারীবাসীর আস্থাভাজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। হাটহাজারীবাসীও এই রুহুল আমিনকে পীরের মত বিশ্বাস করে দুঃখ কষ্ট ভাগাভাগি করতো। কর্মের মাধ্যমে অল্প সময়ে বিশ্বাসের আঁতুড়ঘর গড়ে তোলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়কে। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে মানুষের সেবা করেছেন। পেয়েছেন কর্মবীর উপাধি। ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ হালদা রক্ষায় অনবদ্য ভূমিকা রাখায় জাতীয় পুরস্কার জয় করা হালদার পাহারাদার খ্যাত তিনি। 

২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর হাটহাজারী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে যোগদান করেন রুহুল আমিন। হালদা তখনও ‘বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ’ হয়নি। মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা দেওয়ার পরও তখন হালদার অবস্থা শোচণীয়। নির্বিচারে মাছ শিকার, ইঞ্জিনচালিত নৌকার অবাধ বিচরণ, ড্রেজার দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, গৃহস্থালীর বর্জ্য, পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের বর্জ্য, এশিয়ান পেপার মিলের বর্জ্য হালদাকে বিষিয়ে তুলছিলো।

Advertisement

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহায়তায় পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্টের বর্জ্য ও এশিয়ান পেপার মিল বন্ধ করতে সক্ষম হন এই রুহুল আমিন। হাটহাজারী উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার উন্নয়ন, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।

হাটহাজারী উপজেলায় সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা রুহুল আমিন যেসব অবদান রেখেছেন:

১) হালদা নদীর মা মাছ, ডলফিন এবং জীব বৈচিত্র‍্য রক্ষায় ১৭৮টি অভিযান, ভয়াবহ ফার্নেস তেল দুর্ঘটনা থেকে হালদা নদীকে রক্ষা।
২) দুর্গম মনাই ত্রিপুরা পাড়াকে আমূল বদলে দিয়ে গ্রামকে শহরে রূপান্তর।
৩) জরাজীর্ণ /ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সন্দ্বীপ পাড়া স্কুলকে নান্দনিক স্কুল হিসেবে গড়ে তোলা।
৪) প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে কাজ, বিভিন্ন প্রাইমারি স্কুলের উন্নয়ন।
৫) শেখ রাসেল শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের বাচ্চাদের জন্য শিশুরাজ্য তৈরি।
৬) যোগদানের পর শতাধিক উচ্ছেদের মাধ্যমে বাসস্ট্যান্ড, সরকারহাটসহ সরকারি জমি উদ্ধার।
৭) সরকারি বনের কাঠ পাচার রোধে অভিযান।
৮) ভেজাল বিরোধী প্রায় দুই শতাধিক অভিযান, বিশেষ করে ভেজাল ঘি‘র বিরুদ্ধে
৯) জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য ‘১৫ মিনিটের সেবা’ চালু, যেখানে সেবাগ্রহীতাদের ১৫ মিনিটের মধ্যেই জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করে দেয়া হয়েছে ৫ হাজারের অধিক সেবাগ্রহীতাদের।
১০) উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এবং ইউনিয়ন পরিষদের সহযোগিতায় ‘সার্ভিস এট ডোরস্টেপ থ্রু মোবাইল কোর্ট’ কার্যক্রম গ্রহণ করে হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন। এর আওতায় দোকানে বসেই ট্রেড লাইসেন্স পেয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
১১) সরকারি জমির দখল রোধে কয়েক হাজার গাছের চারা রোপণ।
১২) সরকারি জমির দখলরোধে উচ্ছেদের পরে পাবলিক টয়লেট, রাস্তা, ড্রেইন এবং কালভার্ট নির্মাণ। ৫০ বছরের পুরনো রাস্তা উদ্ধার।
১৩) বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফাইল থেকে কমিশন প্রথা (ঘুষ) সমূলে উৎপাটন। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধে অফিসে ঘুষ বোর্ড স্থাপন।
১৪) পরিবেশ রক্ষায় নানা উদ্যোগ।

১৭ দিন পর ট্রেন চলাচল শুরু চট্টগ্রামে, উৎসবমুখর স্টেশন

এছাড়া ভয়াবহ মহামারী করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করতেও বেশিকিছু উদ্যোগ নেন হাটহাজারী উপজেলার সাবেক এই নির্বাহী কর্মকর্তা:
১) প্রবাসীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হোম কোয়ারেন্টিন নিশ্চিত করা।
২) খাদ্য সহায়তার অংশ হিসেবে বিভিন্ন শ্রেণি, পেশা এবং মধ্যবিত্তদের জন্য ‘ভালবাসার থলে’ প্রদান।
৩) পরিবহন শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য সম্প্রীতির কার্ড ব্যবস্থা চালু করা। যে কার্ডের মাধ্যমে সাড়ে চারশো শ্রমিক পেয়েছেন নিয়মিত খাদ্য সহায়তা।
৪) করোনাকালে পরিবহন সংকটের কারণে কৃষকদের সবজি পরিবহনে ও বিক্রিতে এবং ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে সমস্যা দেখা দেয়ায় কৃষকদের সুরক্ষার জন্য ‘ফসলের মাঠে কৃষকের সাথে’ শীর্ষক কর্মসূচী গ্রহণ। এর আওতায় সরকার প্রদত্ত অর্থ দ্বারা সরাসরি কৃষকের মাঠ থেকে শাক সবজি কিনে চালের সাথে ত্রাণ হিসেবে শাক সবজি প্রদান।
৫) ত্রাণ বিতরনে ‘ত্রিপুরা পাড়া’ মডেল চালু করা।
৬) করোনা আক্রান্তদের বাড়ি লকডাউন করা এবং লকডাউন নিশ্চিত করা।
৭) সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে উপজেলার কাঁচাবাজারগুলো খেলার মাঠ/খোলা মাঠে স্থানান্তর
৮) মাস্ক বিতরণ।
৯) সামাজিক জমায়েত রোধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা

নিরক্ষরদের জন্য সিএমপি’র ভ্যাকসিন নিবন্ধন বুথ

হাটহাজারীতে ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা’ পদে দীর্ঘ দুই বছর দশমাস দায়িত্ব পালন করে গত ১১ জুন পদোন্নতি জনিত কারণে জাতীয় চা বোর্ডে উপ-সচিব হিসেবে যোগ দিয়েছেন সরকারের সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার এই কর্মকর্তা।

বিদায়ের দিন সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ফেইসবুক ওয়ালে তিনি লিখেন,
‘শেষ বিকেলের সূর্যটাও ডুবে যাচ্ছে….
মাগরিবের আযানের সুর ভেসে আসছে মসজিদের মিনার হতে…
লাল গাড়িটাও বের হচ্ছে কমপ্লেক্সের গেইট দিয়ে..
বিদায় হাটহাজারী, আল্লাহ সুস্থ রাখো হাটহাজারিবাসীকে….’

তার এই লেখা কাঁদিয়েছে হাজারো মানুষকে। ফেইসবুক কমেন্টে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ আবেগময়ী মন্তব্য করেছেন। এসেছে হাজারো কান্নার প্রতিকৃতি। কমেন্টে সেখানে উল্লেখ করছেন, কেউ মন থেকে এই রুহুল আমিনকে বিদায় দিতে পারছেন না!

এরপর রাতে তিনি অন্য একটি ফেইসবুক গ্রুপে হাটহাজারী বাসীর উদ্দেশ্যে লিখেন, ‘এই পেইজে যারা আমার পাশে ছিলেন, সমর্থন দিয়েছেন, দোয়া করেছেন তাদের প্রতি আমার সীমাহীন কৃতজ্ঞতা। প্রজাতন্ত্রের একজন সামান্য কর্মচারীর প্রতি আপনারা যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন তা তুলনাহীন। আমি ১০০% নিশ্চিত আপনাদের সাথে আমি মনের অজান্তে দুর্ব্যবহার করেছি। আপনারা আমাকে ক্ষমা করে দিবেন। আপনাদের জন্য দোয়া করি। এই মহামারীতে আল্লাহ প্রিয় হাটহাজারীবাসীকে সুস্থ রাখুক।

বিদায় বেলায় একটা কথা আপনাদের বলে যাই, আমি শুধুমাত্র আল্লাহর ভয়ে সবসময় হারাম খাওয়া থেকে বিরত থেকেছি। আপনাদের দোয়া কামনায় -মোহাম্মাদ রুহুল আমিন।’

কেএন

বোয়ালখালীতে খালে ভাসছে মরা ডলফিন

Advertisement