গ্যাস ফ্রি না করে ভাঙা হচ্ছে ‘ইএম ভাইটালিটি’, মৃত্যু ঝুঁকিতে ৩০০ শ্রমিক!

বিস্ফোরণের সম্ভাবনা!

413
 মোস্তফা কামাল: |  মঙ্গলবার, জুলাই ১৩, ২০২১ |  ৯:১৪ অপরাহ্ণ
       

গ্যাস ফ্রি না করেই ২৫ বছরের পুরোনো তেল পরিবহনকারী জাহাজ ‘ইএম ভাইটালিটি’ কাটছে শিল্পগ্রুপ মোস্তফা হাকিমের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এইচ এম শিপব্রেকিং ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড। জাহাজে থাকা বয়লার রুম, ইঞ্জিন পাম্প, অয়েল ট্যাংক, জেনারেটর লাইনসহ জরাজীর্ণ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ। ফলে জাহাজটিতে প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা গ্যাস নি:সরণ না করেই হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে শত শ্রমিকের প্রাণ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পুরোনো তেলবাহী জাহাজ প্রাকৃতিকভাবে গ্যাসে ভরপুর থাকে। যা মানব দেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এছাড়া ভুলের মাশুল হিসেবে ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।

Advertisement

এদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে ঝুঁকিপূর্ণ এই জাহাজ কাটার সময় ৩০০ শ্রমিকের জীবন ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বাংলাদেশ মেটাল ওয়ার্কার্স ফেডারেশন’র সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলী।

জানতে চাইলে তিনি বলেন, তেলবাহী এই পুরোনো জাহাজ কাটতে আমরা সংগঠনের পক্ষ থেকে বারবার নিষেধ করেছি।  এই জাহাজে বয়লার রুম, ইঞ্জিন পাম্প, অয়েল ট্যাংক, জেনারেটর লাইনসহ জাহাজের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ জরাজীর্ণ। এছাড়া পুরোনো জাহাজে প্রাকৃতিকভাবে জমে থাকা গ্যাস নি:সরণ না করে ভাঙা উচিত না।

তিনি আরও বলেন, পুরোনো অয়েল ট্যাংকার কাটার জন্য কমপক্ষে এক মাস আগে জাহাজে জমাকৃত বর্জ্য পরিষ্কার করতে হবে। তাহলেই জাহাজ ভাঙার সময় বিস্ফোরণের সম্ভাবনা কম থাকে। শিপব্রেকিং শিল্পের জন্য বাংলাদেশে আমদানিকৃত পুরোনো জাহাজ কাটার ক্ষেত্রে এসব পদক্ষেপ নিতে অবহেলা করে। যেকোন শিপব্রেকিং এলাকায় বিষ্ফোরণে প্রতিনিয়ত শ্রমিক নিহত হচ্ছে।

নো অবজেকশন সার্টিফিকেটের বিষয়ে তিনি বলেন,শিল্প মন্ত্রণালয়,পরিবেশ ও বিস্ফোরণ দপ্তর একে অপরের সাথে লিয়াজোঁ করে ছাড়পত্র অর্জন করে থাকে।

এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম জেলার পরিচালক মো. জমির উদ্দিন সিটিজি নিউজকে বলেন,‘ইএম ভাইটালিটি’ জাহাজ ভাঙার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে মোস্তফা হাকিম গ্রুপ কোনো নো অবজেকশন সার্টিফিকেট সংগ্রহ করেনি। এছাড়া মোস্তফা হাকিম গ্রুপ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরে কোনো আবেদন করেছে কিনা এই বিষয়ে আমি অবগত নই।

চট্টগ্রাম বিস্ফোরক অধিদপ্তর পরিচালক মো.তোফাজ্জল হোসেন সিটিজি নিউজকে বলেন, পুরোনো জাহাজ পরিষ্কার করে ভাঙার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর, নৌ বাহিনী ও শিল্প মন্ত্রণালয়, বিস্ফোরণ অধিদপ্তর এসব দপ্তর থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নিয়ে জাহাজ ভাঙ্গা হচ্ছে।

শ্রমিক সংগঠনের অভিযোগের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, পুরোনো জাহাজে গ্যাস ফ্রি বা জমা থাকবে কি থাকবে না তা শ্রমিকেরা কিভাবে জানে। তাদের এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই।

এ বিষয়ে ইন্ডাস্ট্রি অল গ্লোবাল ইউনিয়ন’র ন্যাশনাল কো অরডিনেটর (শিপিং ব্রেক প্রজেক্ট) মাহমুদ শরিফুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে সিটিজি নিউজকে বলেন, কোনো জাহাজ কাটতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট নিতে হয়। ভ্যাসেল কনভেনশন আইনে বলা আছে, যে কোনো দেশে সমুদ্র সীমায় প্রবেশ করার আগে বিক্রেতা দেশ সেই জাহাজ থেকে সম্পূর্ণ বর্জ্য পরিষ্কার করে দিবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর সঠিকভাবে যাচাই না করে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট দিয়ে থাকে। সে কারণে প্রতিদিন কোনো না কোনো শ্রমিক জাহাজ কাটার সময় বিস্ফোরণে মারাত্মক জখম হচ্ছে কিংবা গড়ে দু’তিন-দিনে একজনের মৃত্যু হচ্ছে। এই সকল দুর্ঘটনাই প্রমাণ করে— যারা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট দেয়, তা যথাযথ হচ্ছে না।

এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে মোস্তফা হাকিম গ্রুপের পরিচালক মো.সরোয়ার আলম সিটিজি নিউজকে বলেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এই জাহাজ কাটা হচ্ছে। পরিবেশ ও বিস্ফোরক অধিদপ্তর থেকে নো অবজেকশন সার্টিফিকেট ছাড়া জাহাজ কাটা সম্ভব নয়।

‘কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর এ বিষয়ে অবগত নয়’ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন — আমি আপনার সাথে পরে কথা বলবো বলে মুঠোফোনের লাইন কেটে দেন তিনি।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের কদমরসুল এলাকায় এইচ এম শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে ২৫ বছরের পুরোনো এই জাহাজ ভাঙা হচ্ছে।  জাহাজটি ১৯৯৬ সালের অক্টোবরে জাপানের একটি কারখানায় তৈরি হয়। তৈরির কয়েক বছর পর সৌদি আরবের জ্বালানি তেল পরিবহন কোম্পানি ‘বাহরি’র হাতে ছিলো ‘ইএম ভাইটালিটি’ ।

Advertisement