চট্টগ্রামে শ্বাসের জন্য হাঁসফাঁস জেনেও বেহুশ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর!

337
 মোস্তফা কামাল |  সোমবার, জুলাই ১২, ২০২১ |  ৮:২৬ অপরাহ্ণ
       

চট্টগ্রামে দিন দিন ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ। আর নগরীর হাসপাতালগুলোতে এর সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। বর্তমান পরিস্থিতিতে করোনার রোগীর চিকিৎসায় ৫৫ থেকে ৫৯ হাজার টন লিকুইড অক্সিজেনের চাহিদা থাকলেও চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলোতে যোগান রয়েছে মাত্র ১৯ থেকে ২১ হাজার টন। অক্সিজেন সংকটের বিষয়টি অবগত হলেও নিরসনের উদ্যোগ নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। এতে দুর্ভোগে পড়েছে শ্বাসকষ্টে ভোগা করোনা রোগীরা।

অক্সিজেন জোগানদাতা লিন্ডে ও এক্সপেক্ট্রা সূত্রে জানা যায়, লিন্ডে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ(চমেক) হাসপাতালে দৈনিক ১০ হাজার টন লিকুইড অক্সিজেন, মা ও শিশু হাসপাতালে দু দিনে ৫ হাজার টন এবং ৩ থেকে ৪ দিনে এভার কেয়ার হাসপাতালে ১০ হাজার টন লিকুইড অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে। জুলাই মাসের শেষের দিকে ইমপেরিয়াল হাসপাতালে ১০ হাজার টন অক্সিজেন সরবরাহ করবে লিন্ডে । অন্যদিকে, এক্সপেক্ট্রা চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৪ থেকে ৫ হাজার টন লিকুইড অক্সিজেন সরবরাহ করে থাকে।

Advertisement

দেশে অক্সিজেনের মূল জোগানদাতা লিন্ডে ও এক্সপেক্ট্রা নামে দুটি কোম্পানি বলছে, চট্টগ্রাম নগরীতে সরকারি বেসরকারি হাসপাতালে তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগী এবং করোনা রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় অক্সিজেনের চাহিদা দু থেকে তিনগুণ বেড়ে গেছে। তাই চট্টগ্রাম মেডিকেলে সপ্তাহে দু থেকে তিন দিন দৈনিক দু বার অক্সিজেন সরবরাহ করতে হয়।

চট্টগ্রাম ফিল্ড হাসপাতালের প্রধান উদ্যোক্তা ও নির্বাহী ডা. বিদ্যুৎ বড়ুয়া সিটিজি নিউজকে বলেন, চট্টগ্রামে সরবরাহ ১৯ থেকে ২১ হাজার টন হলেও চাহিদা রয়েছে ৫৫ থেকে ৫৯ হাজার টন লিকুইড অক্সিজেন। অন্যদিকে সিলি›ডার অক্সিজেনও ঘাটতি রয়েছে। নগরীসহ উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় সরকারি—বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা জন্য ভিড় করছেন রোগীরা। তাই হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ায় দৈনিক দু থেকে তিনগুণ (অথার্ৎ ২৩ হাজার টন) অক্সিজেনেরও ঘাটতি থাকছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা রোগীদের জন্য অক্সিজেনসহ মেডিকেল ইকুইপমেন্টের প্রয়োজনীয় চাহিদার ব্যাপারে অবগত হলেও দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি চোখে পড়ছে না।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রামে ধারাবাহিকভাবে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণে নগরীর করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলোতে মুমূর্ষু রোগীর চাপও বেড়ে গেছে। তাই দিন দিন অক্সিজেনের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে ভারত থেকে অক্সিজেন আমদানি বন্ধ হওয়ায় জরুরি মুহূর্তে দেশে অক্সিজেনের সংকট পড়েছে। বর্তমানে অক্সিজেনের যে চাহিদা রয়েছে, তার তিন গুণ পর্যন্ত অক্সিজেন ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে গ্যাসীয় অক্সিজেন তরল থেকে নতুন প্ল্যান্ট (লিকুইফ্যাকশন প্ল্যান্ট) বসাতে হবে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি সিটিজি নিউজকে বলেন, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে সেন্ট্রল অক্সিজেন প্ল্যান্ট ১০ হাজার টন ধারণ ক্ষমতা থাকলেও ৫—৭ হাজার টন অক্সিজেন পূরণ করতে পারে। এই প্ল্যান্টে দু দিন পর পর পুনরায় অক্সিজেন রিফিল করা হয়। কিন্তু এই প্ল্যান্ট অনুযায়ী ৩ থেকে ৪ হাজার টন অক্সিজেন ঘাটতি থাকে। তবে এই মুহূর্তে জেনারেল হাসপাতালে অক্সিজেনের ঘাটতি নেই। এদিকে উপজেলাগুলোতে প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাদের করোনা শনাক্ত হচ্ছে তারা নগরীর সরকারি—বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভিড় করছে। তবে বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি।
তবে কোন রোগীর জন্য কি পরিমাণ অক্সিজেন লাগবে তা নির্ভর করে রোগীর পরিস্থিতির উপর। চট্টগ্রামে করোনা রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে তা পরিস্থিতি ভয়াভহ হলে সামাল দেওয়া যাবে না বলেও জানান শেখ ফজলে রাব্বি।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন শেখ ফজলে রাব্বি অক্সিজেনের ঘাততির কথা স্বীকার করলেও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ও করোনা ফোকাল পার্সন ডা.মো.আব্দুর রব বলছেন, ঘাততি নেই। কিন্তু বাকি হাসপাতালগুলোতে কি পরিমাণ অক্সিজেন দরকার বা ঘাটতি তা জানা নেই বলেও জানান তিনি।

চট্টগ্রামে কোনো হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি নেই উল্লেখ্য করে চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক -প্রশাসন (ভারপ্রাপ্ত) ডা. রাজিব পালিত বলছেন, কোভিড—১৯ সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউতে চট্টগ্রামে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এ কারণে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা যেমন ফাঁকা নেই তেমনি এইচডিইউর (হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট) শয্যারও সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের জন্য আইসিইউ বেডের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা। যার মাধ্যমে রোগীদের ৮০ লিটার পর্যন্ত অক্সিজেন সাপোর্ট দেওয়া যায়। কিন্তু চট্টগ্রামে সরকারি পর্যায়ে শুধু ৪৭ টি যন্ত্র রয়েছে কিন্তু বর্তমানে এই হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা যন্ত্র অর্ধেকই নষ্ট।

সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে সরকারি—বেসরকারি হাসপাতালে অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের ৩১ শতাংশ, অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রায় ১৮ শতাংশ, হাইফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা চট্টগ্রামে প্রায় ১০ শতাংশ যোগান রয়েছে।

জেইউএস/ এসএম

Advertisement