৪ মোড়লের নিয়ন্ত্রণে লিংক রোড পার্কিংয়ের ৬ সিন্ডিকেট!

836
 নেজাম উদ্দিন সোহান |  রবিবার, জুলাই ১১, ২০২১ |  ৭:৪৬ অপরাহ্ণ
লিংক রোড
       

চট্টগ্রাম নগরের বন্দর ও হালিশহর থানার পোর্ট লিংক রোড দখল করে পার্কিংয়ের নামে চাঁদা আদায় করছে দেবাশীষ পাল দেবু, মেজবাহ উদ্দিন মোর্শেদ, ইমরান আহমেদ ইমুসহ সাজ্জাদের নেতৃত্বে ছয়টি সিন্ডিকেট। সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে এসব সিন্ডিকেট বছরে হাতিয়ে নিচ্ছে ৯ কোটি টাকারও বেশি। আর এ কাজে আধিপত্য বিস্তারে প্রায় সময় হতাহতের ঘটনা ঘটলেও কিছুই জানে না প্রশাসন। তবে চাঁদাবাজির বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা স্বীকার করলেও দোষ চাপান অন্যের উপর! যত্রতত্র গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে উক্ত সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকলেও অনেকটাই দায়সারা ট্রাফিক পুলিশ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ট্রাক—কাভার্ডভ্যান প্রতিদিন ঢুকছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এসব গাড়ি বন্দরে ঢুকার আগে পার্কিং করছে বন্দর লিংক রোডের টোলপ্লাজার আগে ও পরেসহ সিবিএ’র গেট এলাকায়। টোলপ্লাজার আগে দুটি স্পটে সক্রিয় চারটি সিন্ডিকেট। এদের মধ্যে একটি সিন্ডিকেট সড়কের দু’পাশে, অন্য সিন্ডিকেটগুলো রেলওয়ের পরিত্যক্ত জায়গা ও সিবিএ গেট এলাকার।

Advertisement

এছাড়া টোলপ্লাজার পরে আরো দুটি সিন্ডিকেট সক্রিয়। টোলপ্লাজা থেকে জাকারিয়া পেট্রোলপাম্প পর্যন্ত একটি, অন্যটি জাকারিয়া পেট্রোলপাম্প থেকে আজিজ মিয়া মসজিদ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে। এসব সিন্ডিকেট পার্কিংয়ের নামে গাড়িপ্রতি আদায় করেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দর সংলগ্ন সিবিএ’র গেট এলাকায় গাড়ি পার্কিং দিয়ে চাঁদা আদায় করেন ইমতিয়াজ সুমন, রাজিব খোকন, আনোয়ার হোসেন ও নাকিব হোসেন নামের চার ব্যক্তি। ইমাতিয়াজ সুমন যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য দেবাশীষ পাল দেবুর সমর্থক। আর রাজিব খোকন রেলওয়ের চাকরীজীবী হলেও সে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক মেসবাহ উদ্দিন মোর্শেদের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। আনোয়ার হোসেন ও নাকিব হোসেন বর্তমান মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমুর কর্মী বলে জানান এলাকার একটি সূত্র।

এদিকে এছহাক ডিপো ব্রিজ থেকে লিংক রোডের টোলপ্লাজা পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশের পার্কিং নিয়ন্ত্রণ করেন দেবাশীষ পাল দেবুর রাজনৈতিক ক্যাডার হিসেবে পরিচিত অদর্শপাড়ার রুবেল, রায়হান, জনি, হৃদয় ও নয়ন। এছাড়া সড়কের উত্তর পাশে রোর্ডস এণ্ড হাইওয়ে ও রেলওয়ের পরিত্যক্ত জায়গায় পার্কিং বানিয়ে টাকা তোলেন সাদ্দাম, মোক্তার, রুবেল, জয় ও রাব্বি। এরা সবাই সাবেক ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতা মেসবাহ উদ্দিন মোর্শেদের অনুসারী বলে এলাকায় পরিচিত। এদের মধ্যে সাদ্দাম রেলক্রসিংয়ে (এনসিওয়াই গেট) জুয়ার স্পটে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার মামালায় এজহারভুক্ত আসামী বলে জানায় স্থানীয়রা।

অন্যদিকে টোলপ্লাজার পরে একই কায়দায় চাঁদা আদায় করেন জামায়াতের নাশকতা মামলার আসামী মামুন। তার সহযোগী হিসেবে কাজ করেন পারভেজ ও নুরু। এরা তিনজনই বর্তমান দেবাশীষ পাল দেবুর গ্রুপ করেন। তাদের হয়ে দিনে টাকা তোলেন মো. শফি এবং রাতে আলা উদ্দিন। এছাড়া জাকারিয়া পেট্রোলপাম্প থেকে আজিজ মিয়া মসজিদ পর্যন্ত সড়ক দখল করে পার্কিং বাণিজ্য করেন স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা (পদবিহীন) হাজী শাহাদাৎ আল নুরী প্রকাশ সাজ্জাদের ভাই মো. গালিব ও তার বন্ধু মামুন। এদের দুজনকে ইতোপূর্বে বিএসআরএম’র লোহা চুরির ঘটনায় গ্রেফতার করেছিলো হালিশহর থানা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিদিন পার্কিং হয়-বন্দর লিংক রোডের সিবিএ’র গেটে ৩৫০, এছহাক ডিপো ব্রিজ থেকে টোলপ্লাজা পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশ ও রোর্ডস এণ্ড হাইওয়ের পরিত্যক্ত জায়গায় ৪০০, জাকারিয়া পেট্রোলপাম্প পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশে ৩০০ ও পেট্রোল পাম্প থেকে আজিজ মিয়া মসজিদ পর্যন্ত সড়কের উভয় পাশে ২৫০ মতো গাড়ি। আর পার্কিং করা প্রতিটি গাড়ি থেকে রাতে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা চাঁদা আদায় করে ছয় সিন্ডিকেট। এ হিসেবে দৈনিক ছয় গ্রুপে পার্কিং বাণিজ্য হয় ২ লক্ষ ৬০ হজার টাকা। যা মাসে ৭৮ লক্ষ এবং বছরে এ চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ কোটি ৩৬ লক্ষ টাকা। এসব টাকা ছয় গ্রুপে আলাদা আলাদা আদায় করলেও তার একটি অংশ স্থানীয় প্রশাসন ও ট্রাফিক পুলিশের হাতেও যায় বলে জানান স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনার মো. আবদুল মান্নান।

এ বিষয়ে জানতে গ্রুপ লিডার সাদ্দাম, মো. গালিব ও রুবেলের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা পার্কিং বাণিজ্যের কথা স্বীকার করলেও নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেন।

সাদ্দাম এই প্রতিবেদককে বলেন, আপনি আসেন, আমাকে সাথে নিয়ে তদন্ত করে দেখেন। এসবে আমি নেই। তবে মো. রুবেল আগে জড়িত ছিলেন বললেও এখন নেই বলে জানান। অপর দিকে মো. গালিব বলেন, আমাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আছে, তাই আপনাকে আমাদের বিরুদ্ধে বলতে পারে। নিজেদের জায়গায় পার্কিং ব্যবসা করেন বলেও জানায় সে। বিএসআরএম’র লোহা চুরির মামলায় গ্রেফতারের বিষয়ে জানতে চাইলে, এটা ভুল বুঝাবুঝি বলে উড়িয়ে দেন গালিব।

তবে পোর্ট লিংক রোডে চাঁদাবাজি হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ৩৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোহাম্মদ আবদুল মান্নান। তিনি প্রতিবেদককে বলেন, পুরো সড়কটিতে পার্কিংয়ের নামে চাঁদা নেয়া হয় জানি, কিন্তু কতো টাকা করে নেয়া হয় তা আমার জানা নেই।

এসব বন্ধে জনপ্রতিনিধি হিসেবে মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি পুলিশ জানে। আর পার্কিংয়ের নামে চাঁদাবাজির নিয়ে বিভিন্ন সময় আলোচনা হয় এবং গ্রেফতারও হয়। তবুও বন্ধ করা যাচ্ছেনা।

স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা হাজী শাহাদাৎ আল নুরী প্রকাশ সাজ্জাদ তার ভাই মো. গালিব চাঁদাবাজিতে জড়িত বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, হযরত শাহ জালাল নামের আমাদের একটি টার্মিনাল আছে। সে ওখানে গাড়ি পার্কিং করে। সড়কে পার্কিংয়ের তথ্য থাকলে আমাকে দেন, আমি দেখবো।

এবিষয়ে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু সিটিজি নিউজকে বলেন, আমার অনেক কমীর্ আছে। কে, কোথায় কী করছে তা বলা কি সম্ভব? তবে আমার জানামতে আনোয়ার হোসেন ও নাকিব হোসেন নামে আমার কোন কমীর্ নেই। তবে সড়কটিতে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি আমি জানি।

ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক মেসবাহ উদ্দিন মোর্শেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটিতে পার্কিংয়ের নামে চাঁদাবাজির বিষয়টি সবার জানা। সিবিএ’র গেট এলাকায় চাঁদা আদায় নিয়ে ২০১৮ সালে দুটি মার্ডার হয়েছে। আপনি পুলিশের সাথে কথা বলেন, ওখানে কারা চাঁদাবাজি করে তারাই আপনাকে বলবে। আর যাদের নাম আপনি বলছেন তাদের কেউ আমার রাজনীতি করেনা। এসব কাজে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই— বলে যোগ করেন তিনি।

বিষয়টি জানতে সাবেক যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা দেবাশীষ পাল দেবুর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিটিংয়ে আছেন বলে জানান। পরে কল করবেন বলে লাইন কেটে দেন।

এবিষয়ে সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি পোর্ট) এসএম মেহেদী হাসান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। কেউ অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেবো। তবে অভিযোগের ব্যাপারে প্রতিবেদককে তথ্য থাকলে দিতে বলেন এবং ব্যক্তিগতভাবে তিনিও খবর নিচ্ছেন বলে জানান।

সিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি ট্রাফিক পোর্ট) শাহেদা সোলতানা বলেন, পার্কিংয়ের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে একটি কন্টেইনার ডিপোর (এছহাক ডিপো) কারণে যানজট হয় বলে জানি। আমি খবর নিয়ে আপনাকে বলতে পারবো। পরে তিনি কল দিয়ে জানান, ওই এলাকায় দেবাশীষ পাল দেবু ও মোর্শেদ গ্রুপ পার্কিংয়ের নামে চাঁদা আদায় করছে। আমি এ বিষয়ে থানাকে বলেছি, তাদের গ্রেফতার করা পুলিশের দায়িত্ব।

জেইউএস/ এসএম

Advertisement