মুক্তিযোদ্ধা পুত্র রুহেলের পিএস রাজাকার পুত্র হাবিব!

2065
 জালালউদ্দিন সাগর |  রবিবার, জুন ২০, ২০২১ |  ৫:৪৫ অপরাহ্ণ
মুক্তিযোদ্ধা পুত্র রুহেলের পিএস রাজাকার পুত্র হাবিব! Rajakar habib Ctgnews.com
       
মুক্তিযোদ্ধা পুত্র রুহেলের পিএস রাজাকার পুত্র হাবিব! Rajakar habib Ctgnews.com
মুক্তিযোদ্ধা পুত্র রুহেল ও রাজাকার পুত্র হাবিব। ছবি : সিটিজিনিউজ.কম

বাবা রাজাকার, ছেলেও একই আদর্শের উত্তরসূরী। সেই স্বাধীনতা বিরোধী পিতার ছেলে বোল পাল্টিয়ে এখন আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতার পিএস। আবুল হাসনাত ওরফে হাবিব খান রাজনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শক ও ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করছেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় সৈনিক সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পুত্র মাহবুবুর রহমান রুহেলের। ছাত্রজীবনে হাবিব খান জামায়াতের অংঙ্গসংগঠন শিবিরের রাজনীতি করলেও রুহেলের হাত ধরে মুজিবকোট পরে বনে যান আওয়ামীলীগ।

অভিযোগ আছে-তার বাবা আব্দুল হান্নান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বিরোধীতাকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত রাজাকার। মিরসরাইয়ের ১৩ মায়ানী ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার কর্তৃক তৈরি করা রাজাকারের তালিকায়ও নাম রয়েছে এই আব্দুল হান্নানের। বিষয়টি নিশ্চিতও করেছেন মিরসরাইয়ের ১৩ মায়ানী ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার আমিনুজ্জামান এবং চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান। একই সাথে পিএস হাবিব খানের বাবাকে রাজাকার বলে চিহ্নিত করেছেন ১৩ নং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কবির নিজামী, ৭ নং ওয়ার্ডের মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন, ৫ নং ওয়ার্ডের মেম্বার নজরুলসহ অনেকেই। এ বিষয়ে একাধিক মুক্তিযোদ্ধার স্বীকারোক্তিমূলক কল রেকর্ড সংরক্ষিত আছে এই প্রতিবেদকের কাছে।

Advertisement

মিরসরাইয়ের ১৩ মায়ানী ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার আমিনুজ্জামান বলেন, মৃত আজিজুর রহমানের ছেলে আব্দুল হান্নান ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত রাজাকার । আব্দুল হান্নানের পরিবারের একাধিক সদস্য মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যুদ্ধের সময় অভিযুক্ত হান্নান পাকহানাদার বাহিনীকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘর বাড়ি চিনিয়ে দিতে সহায়তা করতেন। পরে তার দেখানো ঘর-বাড়িগুলো পাকবাহিনী আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতো।

আব্দুল হান্নান সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান বলেন, স্থানীয় সবাই জানে আব্দুল হান্নান রাজাকার ছিলেন। শুধু তিনিই নন পরিবারের কাজল নামে আব্দুল হান্নানের এক ভাতিজাও পাকহানাদার বাহিনীর সাথে যুক্ত থেকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করেছিলেন।

আব্দুল হান্নান স্বাধীনতা বিরোধী সক্রিয় লোক ছিলেন জানিয়ে ৭ নং ওয়ার্ডের মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন বলেন, উনি দেশ বিরোধী ছিলেন বলেই রাজাকারের তালিকায় তার নাম এসেছে। তাদের পরিবারের আরও একজন স্বাধীনতা বিরোধী লোক আছেন তার নাম কাজল। তিনি সার্ভেয়ারের কাজ করেন। সম্পর্কে সে আব্দুল হান্নানের ভাতিজা ।

আব্দুল হান্নানের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা সম্পর্কে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম উত্তরজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হোসেন চৌধুরী তপু বলেন, যেহেতু হাবিব খান আমাদের আপকামিং লিডারের পিএস সেহেতু এই সম্পর্কে আমার কিছু বলা উচিত না। তবে আপনি যেটা প্রশ্ন করেছেন সেটা আমিও জানি। শুধু আমি নয় স্থানীয়রা সাবাই জানে।

তবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আব্দুল হান্নান মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে বলেন, এসব মিথ্যা। এই ধরনের কোনো কাজের সাথে আমি কোনো দিন সম্পৃক্ত ছিলাম না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজাকার আব্দুল হান্নানের ৬ সন্তানের মধ্যে ৫ মেয়ে ১ ছেলে আবুল হাসনাত। তিনি ২০০৮—১২ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। সে সময়ে তিনি শিবিরের সক্রিয় নেতা ছিলেন। কথিত আছে, আবুল হাসনাত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালযয়ে বাইতুল মাল সম্পাদক ও স্থানীয় ওয়ার্ড জামায়াতের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

পরবতীর্তে নিজের নাম আবুল হাসনাত পরিবর্তন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাবিব খান হিসেবে পরিচিত হতে শুরু করেন। নাম বদল করে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত করে নজর কাড়েন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, সাবেক মন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের পুত্র মাহবুবুর রহমান রুহেলের। অল্প সময়ে রুহেলের একান্ত সহচর হয়ে ওঠেন রাজাকারপুত্র হাবিব, ভাগিয়ে নেন রুহেলের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) পদও।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মাহবুবুর রহমান রুহেলের পিএস হিসেবে রাজাকার পুত্র হাবিবের পরিচিতি দেওয়া বা নিয়োগের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমালোচিত হলেও নেতার ইমেজের কথা চিন্তা করে প্রকাশ্যে কথা বলতে নারাজ তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ছাত্রলীগের অনেক কর্মী এই প্রতিবেদককে বলেন, রুহেল ভাই আমাদের আপকামিং লিডার। আমরা চাইনা তিনি কোনো ভাবেই সমালোচিত হোন। সে কারণে সব জেনেও চুপ করে আছি।

হাবিব খানের বাবা আব্দুল হান্নান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ছিলেন এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মাহবুবুর রহমান রুহেল বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই, আপনি রি চেক করে দেখেন।

মিরসরাইয়ের রাজাকারের তালিকায় আব্দুল হান্নানের নাম আছে এমন কথা বললে তিনি বলেন, ইমপসিবল। এরকম কিছু হওয়ার কথা না।

স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হান্নানের রাজাকার হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এমন তথ্য মাহাবুবুর রহমান রুহেলকে জানানো হলে তিনি তাঁদের নাম জানতে চান। নাম ও মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগের একাধিক কল রেকর্ড এই প্রতিবেদকের হাতে সংরক্ষিত আছে জানালে তিনি বলেন, আমি উনাদের সাথে কথা বলে দেখি। এই ধরনের ইনফরমেশন থাকলে তো আগে আমার কাছে আসার কথা।

মাহাবুবুর রহমান রুহেল একটু হেসেই এই প্রতিবেদককে বলেন, আমার কাছে না এসে এই ইনফরমেশন আপনার কাছে কিভাবে গেলো। আচ্ছা আমি ব্যাপারটি দেখছি। তবে বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পরবতীর্তে কল করার জন্য মাহবুবুর রহমান রুহেলকে এই প্রতিবেদক অনুরোধ করলেও পরবর্তীতে তিনি আর কল করেন নি।

বাবা আব্দুল হান্নান ও বিএনপি—শিবিরের রাজনীতির বিষয় সম্পর্কে জানতে চাইলে আবুল হাসনাত হাবিব খান বলেন, এসবের কোনো সত্যতা নেই। যারা বলছেন আমার বাবা রাজাকার ছিলেন তাদের তথ্য প্রমাণ দিতে বলেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন অন্যকোনো রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত থাকার কথাও অস্বীকার করেন হাবিব খান।

এসএম

Advertisement