চসিকের ফান্ড শূন্য, গ্র্যাচুইটি বকেয়া ৫৬ কোটি টাকা

৮ বছর ঘুরেও গ্র্যাচুইটি পাচ্ছেন না চসিকের ৩৩১ জন

242
 জালালউদ্দিন সাগর |  বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২১ |  ৬:০৭ অপরাহ্ণ
       

চাকরী শেষে সবারই প্রত্যাশা থাকে কর্মস্থল থেকে প্রাপ্ত অর্থে কিছু একটা করে জীবনের বাকি সময়গুলো কাটানোর। সেই প্রত্যাশা থেকে অনেকে চাকরীকে জীবনের নিশ্চয়তা হিসেবে লালন করে। আব্দুর রহীমও(ছদ্ম নাম) একই আশা নিয়ে চাকরী জীবন শুরু করেছিলেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে (চসিক) পরিচ্ছন্নতা বিভাগে চাকরি করতে তিনি। চট্টগ্রাম নগরীকে তকতকে চকচকে করতেন শ্রম দিয়েছেন বছরের পর বছর। শহরকে পরিচ্ছন্ন করলেও আজ তার ঘরই অপরিষ্কার—অন্ধকারাচ্ছন্ন। অসুস্থ শরীর নিয়ে পড়ে আছেন বিছানার এক কোণে। চার পাশ স্যাঁতসেঁতে। আব্দুর রহীমের রোগাক্রান্ত শরীরও স্যাঁতসেঁতে ভাব । এই নুইয়ে পড়া শরীর নিয়ে আব্দুর রহীম ফাইল হাতে ঘুরছেন চসিকের বারান্দায় বারান্দায় বছরের পর বছর। দেখা হতেই বললেন, বাবা কাল সকালে ওষুধ খাওয়ার টাকা নাই, কিছু টাকা দাও। জীবনের ত্রিশটি বছর কাটিয়েছেন এই চসিকে। আশেপাশের সব কিছুই তার চেনা থাকলেও অথচ আজ অচেনা। পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। শুধু একা…

চসিকের সাবেক চিকিৎসা বিভাগের কর্মকর্তা ফাতেমা বেগম(ছদ্ম নাম)। দুই কন্যা সন্তানের জননী। স্বামী মারা গেছেন সেই কবে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, সবাই এখন শ্বশুরবাড়ি। থাকেন দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সাথে। ৬৫ ছু্ঁই ছুঁই এই নারীও এক সময় চাকরি করতেন চসিকে। তার সাথেও যেন চসিকের সম্পর্কটা আমৃত্যুর। তিনিও ঘুরছেন চসিকের বারান্দায়-মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা এই নারীর আকুতিতেও মন গলেনি কারও। মেয়রের পদের ব্যক্তি পরিবর্তন হয় কিন্তু এই দায়িত্ব নেয় না কেউ।

Advertisement

আব্দুল হামিদ (ছদ্ম নাম)। চসিকের সাবেক প্রকৌশলী। হাই ডায়াবেটিস রোগে ভুগছেন অর্ধযুগ। চসিকের বারান্দায় জুতোর তলা ক্ষয়ে দপ্তরে ঘুরার কাতারে আব্দুল হামিদও একজন। শুধুমাত্র রহীম, ফাতেমা ও হামিদরা নন এই তালিকায় আছেন চসিকের হতভাগ্য সাবেক ৩৩১জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী। যারা চসিক থেকে অবসরে যাওয়ার পর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা পেলেও সরকারের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুবিধা গ্র্যাচুইটি অর্থ পাননি গত ৮ বছরেও।

চসিক সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০১৪ সালের পর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত অবসরে যাওয়া কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রাপ্য প্রায় ৫৬ কোটি টাকা। চসিকের সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন দায়িত্ব থাকা কালীন গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ও চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ৫ দফায় প্রায় ৪ কোটি টাকা গ্র্যাচুইটি ফান্ডের অর্থ প্রদান করলেও এখনও ৫৫ কোটি ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ৭৮৩ টাকা বকেয়া।

সাবেক প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন বলেন, আমার সময়ে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করেছি অবসরে যাওয়া চসিকের কর্মকতার্—কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি বাবদ প্রাপ্য অর্থ প্রদান করতে। কিন্তু ফান্ড স্বল্পতার কারণে পুরো প্রাপ্য টাকা প্রদান করা সম্ভব হয়নি।

চসিকের ফান্ড শূন্য থাকার কারণে অবসরে যাওয়া সাবেক কর্মকর্তা—কর্মচারীদের গ্র্যাচুইটি ভাতা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে চসিক সূত্র।

জানতে চাইল চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক বলেন, চসিকের রাজস্ব আদায়ের উপর নির্ভর করছে ফান্ড। বিষয়টি গুরুত্বে সাথে বিবেচনায় রেখে ইতোমধ্যে কিছু কিছু দেওয়ার চেষ্টা করছি। গত ৮ বছরেরও কেন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফান্ড না থাকলে কোথা থেকে দেবো।

সুধীজনদের অভিমত, বছরে হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট হয় এই চসিকে। অথচ সেই উন্নয়ন বাজেট থেকে দুনীর্তির কারণে লোপাট হয়ে যায় শতশত কোটি টাকা। মাত্র অর্ধশত কোটি টাকার ফান্ডের অভাবে গত আট বছর ধরে জুতোর তলা ক্ষয় করা চসিকের সাবেক ৩৩১জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভাগ্য ঝুলে আছে ফান্ডের অজুহাতে!

এসএম

Advertisement

CTG NEWS