মাদক ব্যবসায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকে রাঘববোয়ালরা

262
  |  মঙ্গলবার, জানুয়ারি ৫, ২০২১ |  ১২:০৬ অপরাহ্ণ
       

উদ্দীন রাকিব : মাদকের ভয়াবহতা ক্রমশ বেড়ে চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রতিদিন মাদক উদ্ধারের ঘটনায় জানান দিচ্ছে এর চিত্র। কিছু সংখ্যক মাদক চালান ধরা পড়লেও অধিকাংশই ছড়িয়ে পড়ছে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। তবে মাদক চালান বহনকারীরা ধরা পড়লেও রাঘববোয়ালরাই থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বেকার যুব সমাজকে সম্পৃক্ত করে এ ব্যবসায় সাম্রাজ্য বিস্তারের মাধ্যমে বিশাল অর্থবিত্তের মালিক হওয়া।

Advertisement

২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে অর্ধশত কোটি টাকার মাদক উদ্ধার হয়েছে। সহজে বড়লোক এবং লাভজনক ব্যবসা হওয়ায় রোহিঙ্গাসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকজন এ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ছেন। সিন্ডিকেট ভিত্তিক এ ব্যবসা মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতারা।

২০২০ সালের ৮ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ভোরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে দুই নারীসহ ৪ মাদক ব্যবসায়ীকে ৫ হাজার ৬৫০ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ১৮ ডিসেম্বর নগরীর বাকলিয়া থানার নতুন ব্রিজ এলাকা থেকে ২৭ হাজার পিস ইয়াবাসহ ভাই-বোনকে গ্রেফতার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ২১ অক্টোবর সন্ধ্যায় চকবাজার থানার ওয়াসা মোড় এলাকার হক লাইব্রেরির সামনে থেকে রাঙ্গুনিয়া থানায় কর্মরত কনস্টেবল মো. মোশারফ হোসেন (৩৭) কে  ২ হাজার ৮৭৫ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে র‌্যাব। শুধু বাংলাদেশি মাদক ব্যবসায়ী নয় মায়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গারাও এ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করছে। ৬ ডিসেম্বর নগরীর বাকলিয়া থানার নতুন ফিশারিঘাট এলাকায় মাদক বিক্রির সময় মোঃ রশিদ উল্লাহ (২৫) নামে এক রোহিঙ্গা যুবককে ১ হাজার ৮৫০ পিস ইয়াবাসহ হাতে নাতে গ্রেফতার করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতের মিজোরাম হয়ে মণিপুর, চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও আনোয়ারা উপজেলাকে মাদক পাচারের নিরাপদ ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করছে মাদক ব্যবসায়ীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির ফলে মাদক ব্যবসায়ীরা ভারতের মিজোরাম হয়ে মণিপুর রুট এবং নৌপথে এই দুটি উপজেলার রুট গুলোকে নিরাপদ মনে করে।মায়ানমার থেকে সাগরপথে আসা মাদক, টেকনাফ ও উখিয়াসহ কক্সবাজার দিয়ে ভারতের মিজোরাম হয়ে নিরাপদে মাদক সরবরাহ করে মাদক ব্যবসায়ীরা। এরপর মাদকদ্রব্য গুলো বিক্রির উদ্দেশে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠিয়ে দেয় তারা।

আনোয়ারা এবং বাঁশখালীর কমপক্ষে ২৩টি পয়েন্টে মাদক সরবরাহ করা হয়। মাদক সরবরাহ করা হয় এমন পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে বাঁশখালীর প্রেমাসিয়া, গণ্ডামারা, কদমরসুল, বাহারছড়াসহ ১০ টি পয়েন্ট। আনোয়ারার পারকী সৈকত, বাচ্চু মাঝির ঘাট, সাঙ্গুর মোহনা, পূর্ব গহিরা, গলাচিপাসহ ১৩ পয়েন্ট।

মাদক বহনকারী থেকে ইয়াবা ব্যবসায়ী হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, মায়ানমার থেকে ইয়াবা এনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে রোহিঙ্গা নারী, কিশোর ও পুরুষরা । গত এক বছরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ইয়াবা চোরাচালান চক্র গড়ে উঠেছে। এছাড়া ইয়াবা বহন এবং খুচরা ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে তারা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মাদক মজুদ ছাড়াও বিভিন্ন মোড়কে ইয়াবার প্যাকিং করা হয়। পরে সেগুলো চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৪৬ কোটি ৬২ লাখ ৮৬ হাজার টাকার মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৪ লাখ ৪১ হাজার ২০৫ পিস ইয়াবা, গুড়া ইয়াবা ৩ গ্রাম, গাঁজা ৯১৬ কেজি, গাঁজা গাছ ১টি, ফেন্সিডিল ৩৫৬০ বোতল, তরল ফেন্সিডিল ২ লিটার, এসকফ ১ হাজার ২৩০ বোতল, বিলাতীমদ ৮২৯ বোতল, বিয়ার ২ হাজার ৮১১ বোতল, চোলাইমদ ৩ হাজার ৯০১ লিটার, ডিনেচার্ড স্পিরিট ৪৬৪ লিটার, মিথানল ১ হাজার ২০০ লিটার, পচুই ৫ হাজার ২৩০ লিটার, মুলি ১ হাজার ১৪৮ কেজি, ওয়াস ২৪ হাজার ৩০৯ লিটার, তাড়ী ১০ লিটার, নগদ টাকা উদ্ধার ১৪ লাখ ৭ হাজার ৯৩০ টাকা উদ্ধার করা হয়।

এসময় জব্দ করা হয় শাড়ী ১০৮ পিস, সুপারি ৫০০ পিস, ফয়ের ৪০ পিস, অস্ত্র (এল.জি) ১টি, গুলি ২ রাউন্ড, ট্রাক ২টি, পিকআপ ভ্যান-৬টি, প্রাইভেটকার-৩টি, সিএনজি- ৮টি, ফিশিং বোর্ড ১টি, মোটরসাইকেল ১২টি, লেগুনা ১টি, অটো-১টি, টমটম-১টি, মোবাইল সেট- ৪২টি।

গত এক বছরে এসব ঘটনায় ২ হাজার ৯৮৯ টি মামলায় আসামী করা হয়েছে ৩ হাজার ২৬৬ জনকে।

চট্টগ্রামে মাদকের ভয়াবহতা ও বিস্তার সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন প্রফেসর এ.বি.এম. আবু নোমান সিটিজিনিউজকে বলেন, প্রত্যকটা মহামারিতে কিছু অসাধু চক্র সক্রিয় হয়। সে কারণে হয়তোবা মাদক ব্যবসায়ীরা করোনাকে সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। চট্টগ্রামে করোনার মধ্যে দিয়েও বিভিন্ন অভিযানে অর্ধশত কোটি টাকা মাদক উদ্ধার হওয়ার বিষয়টি অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। সরকারের বিশেষ নজর ছিল বিধায় এ ধরনের উদ্যাগ সফল হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অনেকেই আছে এ ব্যবসায় জড়ানোর কারণে বারবার জেল খাটা সত্ত্বেও আবার মাদক ব্যবসায় জড়ায়। যেটাকে আইনের ভাষায় বলা হয় ‘অভ্যাসগত ক্রিমিনাল’। সংঘবদ্ধ চক্র এসব মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের দেশে মাদক ব্যবসা বিস্তারের পিছনে আর্ন্তজাতিক সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে। মাদক ব্যবসায় সাধারণত যুবকদের টার্গেট করা হয়ে থাকে। মাদক ব্যবসায়ীরা মাদকদ্রব্য নিয়ে টেকনাফ ও উখিয়া হয়ে সড়ক ও নৌ পথে সহজে চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশ করে। অন্যদিকে মায়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবার মাফিয়া চক্র। শরণার্থী ক্যাম্প ঘিরে সক্রিয় রয়েছে বেশ কয়েকটি চক্র। সিন্ডিকেট ভিত্তিক এ ব্যবসা মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতারা। কিন্তু মাদকের চালান যারা বহন করে, তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও এই ব্যবসায় জড়িত রাঘববোয়ালরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’র চট্টগ্রাম জেলার উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রাশেদুজ্জামান বলেন, করোনার মধ্যে মাত্র একদিন আমাদের অভিযান বন্ধ ছিল। মাদক ব্যবসায়ীরা যেভাবেই হোক সুযোগ নিবেই। আমাদের অভিযান এবং গোপন তৎপরতা সবসময় চলমান আছে। অভিযানে আসলে কখনোই সন্তুষ্ট হওয়া যায় না। অবৈধ মাদক যাতে চট্টগ্রামে প্রবেশ না করে সেদিকে আমাদের নজরদারি আছে। তারপরও আমাদের সীমিত জনবল দিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি মাদক ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বন্ধ করার জন্য।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’র চট্টগ্রাম বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো মজিবুর রহমান পাটওয়ারী সিটিজিনিউজকে বলেন, করোনার মধ্যে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আমাদের অভিযান অব্যাহত ছিল। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আমরা আরও বেশি মাদক উদ্ধার এবং ব্যবসায়ীদের আটক করতে সক্ষম হয়েছি। করোনার দোহাই দিয়ে যদি আমরা অভিযান পরিচালনা বন্ধ করতাম তাহলে মাদক ব্যবসায়ীরা এটাকে সুযোগ হিসেবে নিতো।

তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের মাদক ব্যবসায়ীদের ছত্রছায়ায় রোহিঙ্গারাও মাদক ব্যবসায় ব্যাপক আধিপত্য বিস্তার করছে। সম্প্রতি মাদক ব্যবসায়ীরা নারীদেরকে দিয়ে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করার চেষ্টা করছে। মাদক ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রুট পরিবর্তন করে। বিভিন্ন কলাকৌশলে তারা এসব মাদক বহন করে থাকে। পর্যাপ্ত জনবল, গাড়ি, নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র এবং মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের সুবিধা যদি থাকতো তাহলে আমাদের অভিযান আরও জোরদার করা যেতো। মাদক ব্যবসায়ীরা কোন ধর্মের, সমাজের, পরিবারের, রাষ্ট্রের নয়। তারা বুঝে শুধু মাদকের বিনিময়ে টাকা। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের যে জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে তা বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা সর্বদায় তৎপর।

এসএম

Advertisement

CTG NEWS